কিস্সা
রোঘি কা-৩
কুকুর নিয়ে ফান্ডা ঝাড়ছি। অথচ পড়েছি বিশালদেহী দুই কুকুরেরই খপ্পরে। বিপন্ন
চিত্তে প্রার্থনা করছি, “প্রভু রক্ষা করো। দরকার নেই আমার রোঘির আপেল বাগানের
ছবির। বড় বাজারের ফল পট্টির আপেলের ছবি পোস্টাবো তাও ভালো। এ বিপদ থেকে এই অধমকে
রক্ষা করো।”
উর্গম উপত্যকায় দাঁড়িয়ে ওক গাড়োয়ালি
যুবতী আমাকে একবার বলেছিল,“আপ আগর দিল সে চাহোগে তো ভগবান ভি দিল কা মুরাদ শুনতা
হ্যায়।” তার সেই লাজুক চোখের দৃষ্টি আমি আজও ভুলিনি। জানি না সত্যিই মন থেকে চাইলে
ঈশ্বর মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করেন কিনা? এ দেশের প্রায় সব তীর্থক্ষেত্র আমার ঘোরা। সে
কেদারই হোক বা তিরুপতি। রালং মনাস্ট্রি হোক বা স্বর্ণমন্দির। কামাখ্যা হোক বা
হজরতবাল কিংবা আজমেঢ় শরিফ। ঘোরার নেশায় ঘুরেছি। কিন্তু কোথাও বুকের কাছে দু’হাত
জড়ো কিছু চাইনি। ভগবানের কাছে আবার কি চাইব? এটাই আমার মাথায় আসে না। কিছু চাওয়ার
জন্য তো দুর্গম পথ পেরিয়ে যাই না। শুধু দু’চোখ ভরে দেখতে যাই। ওই পথের ধুলো মাখা
ক্লান্তিতেই সব পাওয়া হয়ে যায়।
কিন্তু এখন চাইছি। এই চাওয়াটা বোধহয় বাঁচার তাগিদে। বিপদ থেকে বের হয়ে আসার
আর্তি ছাড়া আর কিছু নয়। আসলে ধন,দৌলত,ঐশ্বর্য নয়,বিপাকে পড়লে মানুষ বুঝতে পারে
জীবন কত দামি। অথচ বাকি সময়টা জীবনকে আগলে রাখার তেমন তাগিদ আমরা অনুভব করি না।
তাই কখনও কখনও স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে জীবনই তার মূল্য মানুষকে টের পাইয়ে দেয়। যেমন আমি
টের পাচ্ছি এবং মনে মনে বেঁচে ফেরার প্রার্থনা করছি।
| ভারতের শেষ গ্রাম রোঘি |
আমার প্রার্থনা? নাকি সেই
গাড়োয়ালি যুবতীর কথা সত্যি করতেই স্বয়ং ঈশ্বর নেমে এলেন ধরতিতে। মানে রোঘি গ্রামে।
এক নারী কন্ঠের ডাক শুনতে পেলাম। বলাই বাহুল্য সে ডাক আমার উদ্দেশ্যে নয়। সেই ডাক
শুনেই দুই পালোয়ান সারমেয় মুখ দিয়ে একটা অদ্ভুত আওয়াজ করে রোমশ লেজ নাড়তে নাড়তে
আমাকে ছেড়ে পাথরের সিঁড়ি পথে উধাও হয়ে গেল। যাওয়ার আগে আমার দিকে ছুঁড়ে দিয়ে গেল
একরাশ অবজ্ঞা। ধড়ে প্রাণ এল। স্ট্যাচু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার শাস্তি ঘুচল। হেমন্তের
রোদ,হুল ফোটানো হিমেল হাওয়া, রোদজামা গায়ে দেওয়া আপেল বাগিচা,সবুজ মখমলের মতো
পাহাড়ের ঢাল...সব ফিরে পেলাম। আর ফিরে পেলাম অনেক কাল আগে হারিয়ে ফেলা একটা
শিরশিরে অনুভূতি। যে অনুভূতি বুকের ভেতর ডুবো পাহাড়ের জন্ম দেয়। ঘাড় ঘুরিয়ে
তাকালাম টিলার ওপর বাড়িটার দিকে। পাথরের পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। পাঁচিলের ওপারেএকটা
আপেল রঙা মুখ। তার ওপর তেরচা ভাবে এসে পড়েছে হেমন্তের কাঁচা হলুদ রোদ। তার শরীরে
রঙিন পোশাক। মাথায় সবুজ হিমাচলী টুপি। নিচ থেকে ওপরের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতে
থাকতে দেখলাম পাথরের পাঁচিল ঘেরা বাড়িটা ক্রমশ একটা দুর্গের চেহারা নিচ্ছে। সেই
দুর্গের চৌহদ্দি থেকে এক রাজকন্যা অবাক চোখে দেখছে অসহায় এক ভবঘুরেকে।
Comments
Post a Comment