কিস্‌সা রোঘি কা-২

এ যেন স্ট্যাচু স্ট্যাচু খেলা। আমিও একই মুদ্রায় দাঁড়িয়ে, ওরাও নট নড়ন চড়ন। ওরা মানে দু-দু’খানা ষন্ডা মার্কা সারমেয়। এক কথায় গ্রে হাউন্ড মার্কা। গায়ের রং কালো। আমার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছেচওড়া রোমশ লেজ নীচের দিকে নামানো। মানে যে কোনও সময় সামনের লক্ষ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য তৈরি। গায়ে লোম ভর্তি। তাগড়াই চেহারা। গলায় ধাতব পাট্টা বাঁধা। তার ওপরের দিকে কাঁটা কাঁটা মতো। বেশি উচ্চতার পাহাড়ি গ্রামগুলোর সারমেয়দের শরীর রোমশ হয়। ওই কড়া ঠান্ডা প্রতিরোধ করতেই ঈশ্বর এই বন্দোবস্ত করে রেখেছেন। যে কোন পাহাড়ি শহরের নেড়ি গুলোও দেখতে বেশ গাবলু গুবলু গোছের হয়। বিশেষ করে ছোট্ট কুকুর ছানা গুলোকে দেখলেই চটকাই-মটকাই করতে ইচ্ছে করে। মনে হয় নিয়ে আসি সঙ্গে করে। একবার স্পিতি উপত্যকার কাজায় গিয়ে একটা কুট্টুস মার্কা কুকুর ছানাকে পায়ের কাছে ঘুর ঘুর করতে দেখেছিলাম। খুব লোভ হয়েছিল সঙ্গে করে নিয়ে আসার। গাড়িতে উঠিয়েও ফেলে ছিলাম। বাইরে তখন প্রবল হিমেল হাওয়া বইছে। গাড়ির ইঞ্জিন স্টার্ট ছিল। কাজ করছিল হিটারও। ফলে সিটের ওপর রাখতেই দিব্যি গাড়ির ভেতরের উষ্ণতায় দুটো ছোট্ট থাবার ওপর মুখ রেখে চোখ বুজেছিল একরত্তি কুকুর ছানাটি। কিন্তু মুশকিল হল ওর মা খুঁজে বেড়াচ্ছিল ওকে।  গম্ভীর ভাবে বার কয়েক এসে ঘুরে ঘুরে মেপেও যাচ্ছিল আমাকে। বোধ হয় সন্দেহ করেছিল। তাছাড়া ওদের ঘ্রাণশক্তি প্রবল হয়। যাই হোক শেষে অবশ্য আর নিয়ে আসিনি ওকে ফিরিয়ে দিয়েছিলাম ওর মায়ের কাছে। গাড়ির উষ্ণতার থেকেও মায়ের শরীরের ওম ওর বেশি প্রয়োজন ছিল সেদিন। পাহাড়ে গিয়ে কুকুর ছানা বাড়ি নিয়ে আসার ইচ্ছে হয়তো অনেকেরই হয়েছে। তবে নিয়ে এলে এই চ্যাটচ্যাটে মার্কা হাঁসফাঁস শহরে ক’দিন ওদের আয়ু হবে তা বলা মুশকিল।
ভারতের শেষ গ্রাম রোঘি
অধিকাংশ পহাড়ি গ্রামগুলোর মানুষ কুকুর পোষেন। সেই সব কুকুরেরা রীতিমত ট্রেইনড হয়। তারা ভেড়ার পাল চড়িয়ে আনে সবুজ বুগিয়াল থেকে। শয়ে শয়ে ভেড়াকে দেখেছি লাইন দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে খান দু’য়েক প্রশিক্ষিত সারমেয়। মেষ পালক হয়ত আছেন একেবারে সামনে। তার হাতে সরু একটি ছড়ি। পিছন পিছন চলেছে ভেড়ার দল। সেই ভেড়া গুলিকে সারিবদ্ধ ভাবে নিয়ে আসার দায়িত্ব কিন্তু সারমেয় কুলের। এবং তারা সে দায়িত্ব দিব্যি পালন করেশুধু তাই নয়, পাহাড়ি গ্রামে রাত কাটাতে গিয়ে দেখেছি গোটা রাত গবাদি পশুর ডেরা পাহারা দেয় সেইসব প্রশিক্ষিত সারমেয়রাই। শিকারের লোভে রাতের বেলায় এই সমস্ত গ্রামগুলোয় হানা দেয় বন্য জন্তুরা। তখন অনেক সময় এই গৃহপালিত সারমেয় কুলকে বন্য জন্তুদের সঙ্গে যুঝতে হয়। জঙ্গলের কোর এরিয়ার বাসিন্দারা প্রথমেই শত্রুর গ্রীবা লক্ষ্য করে হামলা চালাতে পছন্দ করে। একবার খাপে খাপ হয়ে গেলে টার্গেট কুপোকাত হতে বাধ্য। তাই গ্রামের মানুষ তাঁদের পোষা সারমেয়র গলায় ওই কাঁটা ওয়ালা পাট্টা পরিয়ে রাখেনযাতে তাঁদের বিশ্বস্ত পাহারাদারদের গ্রীবায় হিংস্র বন্য জন্তুরা কামড় বসাতে না পারে। মানে মোদ্দা কথা যাতে বন্য জন্তুরা পোষা কুকুরের ঘেঁটি কামড়ে ধরতে না পারে তার একটা রক্ষা কবচ আর কি। কিন্তু এই মুহুর্তে আমার রক্ষা কবচ কে হবে?

Comments

Popular posts from this blog