কিস্সা রোঘি কা: পাঁচ
আপেল বাগানের মালকিন চন্দ্রকান্তাজি বেশ হাসি খুশি। টেনে নিয়ে গেলেন আপেল বাগানের ভেতর। বললেন,“লিজিয়ে খিঁচিয়ে তসবির।”
আপেলের ও আপেল বাগিচার ছবি তোলা হয়ে গেলে ওনাকে জিঞ্জেস করলাম, “আপনার একটা ছবি তুলব?”
চন্দ্রকান্তার কুঁচকে যাওয়া গালের আপেল রঙা চামড়ার আভা আরও রাঙা হল,“হায় রাম,ম্যারা তসবির খিঁচোগে? ক্যায়সা আয়ে গা?”
ওনার ছবি তুললাম। আপেল গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে বেশ হাসিখুশি পোজও দিলেন। ক্যামেরার এলসিডি স্ক্রিন মেলে ধরে ওনাকে ছবিগুলো দেখালাম। নিজের ছবি দেখে উনি হেসেই খুন। বুঝলাম খুশি হয়েছেন।
এলসিডি স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে চন্দ্রকান্তা বললেন,“থোরা রুকো, হাম অভি আতে হ্যায়।” কথা শেষ করে উনি হাঁটা দিলেন। আপেল গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে দেখলাম চন্দ্রকান্তা দ্রুত মিলিয়ে যাচ্ছেন পাথরের সিঁড়ির ধাপে। ওনার পিছু পিছু আমিও এগিয়ে গেলাম সেই দিকে। আমার সন্ধানী চোখ খুঁজছিল কুকুর দু’টোকে। পাছে আবার না এসে পড়ে তাই ভয়ে ভয়ে ওই পাথরের সিঁড়ির কাছে এসে দাঁড়ালাম। পাথরের পাঁচিলে রোদ লেগে আছে। কুকুর দু’টো কোথায় গিয়ে বসে আছে কে জানে? যেখানটায় সেই রাজকন্যাকে এক ঝলক দেখেছিলাম সেই জায়গাটা বড্ড বেশি খাঁ খাঁ করছে। ওই জায়গাটায় কারুর যেন এসে দাঁড়ানোর কথা। সে ছিল। কিন্তু এখন নেই। আপেল বাগান দিয়ে ঝড়ো হিমেল হাওয়া বইছে। সেই হাওয়ার দাপটে আপেল ভর্তি গাছগুলো নুইয়ে পড়ছে। হাওয়ার সোঁ সোঁ আওয়াজ স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি।
একটু পরেই পাথরের সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলেন মালকিন। দু’হাতে খান চারেক প্রমাণ সাইজের আপেল। লাল টুকটুকে রয়্যাল আপেল। আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে সস্নেহে বলে উঠলেন,“ রাস্তে মে ভুখ লাগে তো খা লে না।”
“জি, শুক্রিয়া।” বলে আপেল ক’টা নিলাম। বাগিচার পাশেই ঢালু জমি। নিচের দিকে দেখা যাচ্ছে মাটির রাস্তা। রাস্তায় নামার জন্য সিঁড়ির মতো পাথরের কয়েকটা স্ল্যাব পাতা আছে। তাতে পা দিয়ে সাবধানে নিচে নেমে এলাম।
“আরাম সে যানা।” সিঁড়ির ধাপে দাঁড়িয়ে গাঢ় স্বরে বলে উঠলেন চন্দ্রকান্তা।
পিঠে ক্যামেরার ব্যাকপ্যাক। দু’হাত ভর্তি আপেল। ঝকঝকে রোদ মাখা মাটির রাস্তায় দাঁড়িয়ে একবার মাথা উঁচু করে তাকালাম বাড়িটার দিকে। সেই পাথরের পাঁচিলটার দিকে। সেই জায়গাটার দিকে। কেউ দাঁড়িয়ে আছে কিনা শেষবারের মতো একবার দেখার চেষ্টা করলাম। ঘন নীল আকাশও যে মনকে এমন বিষণ্ণ করে তোলে তা আগে কোনোদিন টের পাইনি। এখন আমার মন খারাপের রং নীল। ঘন নীল। একটু আগে ওই ঘন নীল আকাশের ক্যানভাসেই দেখে ছিলাম সেই আপেল রঙা মুখ।
হিন্দিতে একটা কাঁহাবত আছে, “উলফত মে আকসর আ্যায়সা হোতা হ্যায় / আঁখে হাসতি হ্যায় আউর দিল রোতা হ্যায়।”
পাথরের সিঁড়ির ওপর দাঁড়িয়ে আমার দিকে হাত নেড়ে বিদায় জানাচ্ছেন চন্দ্রকান্তা। হাসি মুখে ওনার উদ্দেশ্যে হাত নাড়লাম। রাস্তায় নামতেই মনে হল, আপেল রঙা রাজকন্যারা রাজপুত্তুরদের জন্য দুর্গের প্রাচীর ডিঙোয়,ভবঘুরেদের জন্য নয়। কিন্তু সন্তান বাড়ির বাইরে পা রাখলে মায়েরা বোধহয় এমন করেই উদ্বিগ্ন মুখে দাঁড়িয়ে থাকে অনন্তকাল। সে কিন্নর হোক বা কলকাতা।
#ছবিঃ রোঘি,কিন্নর।
(এ কাহিনি এখানেই শেষ করলাম। ভালো লাগা,মন্দ লাগা, খোলা মনে জানাতে কেউ দ্বিধা করবেন না। আবার হয়তো অন্য কোথাও অন্য কোনও কাহিনি কুড়িয়ে পাব। কারণ আমার এইসব ছাইপাস লেখা জন্ম নেয় পথের ধুলো থেকে, লেখার টেবিল থেকে নয়।)
Comments
Post a Comment