কিস্‌সা রোঘি কা: চার

ইয়ে লমহা ভি গুজর জায়েগা/ ইয়ে মৌসম ভি বদল জায়েগা/ না হোঙ্গে হম,না তুম হোঙ্গে ইহা/ বাস্ ইয়াদোঁ কা সিলসিলা রহে জায়েগা।

কিছু কিছু মুহুর্ত বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। কিন্তু মনে দাগ কেটে যায়। দুর্গের অন্তরালে চলে যায় হেমন্তের রোদ মাখা মুখ। দেখতে পাই এক মধ্যবয়স্কা নারী পাথরের সিঁড়ির ধাপ বেয়ে নেমে আসতে আসতে আমার দিকে হাত নেড়ে কিছু একটা বলছে। রোঘিতে সোঁ সোঁ করে হাওয়া বইছে। কিছু শুনতে পাচ্ছি না। মনে মনে ভাবলাম,এই রে,এবার বোধহয় ফুল কেস খেলাম। নিশ্চয়ই বলবে, না বলে কেন ওনাদের আপেল বাগানে ঢুকেছি। নির্ঘাত থানা পুলিশ হবে। দিন কয়েকের হাজত বাস নিশ্চিত। রোঘিতে তো থানা-টানা দেখিনি। তবে কল্পাতে দেখেছি। আমি যে চোর নই তা প্রমাণ করতে ক্যামেরাটা তুলে ধরে লেন্স হুডটা লাগানোর অভিনয় করতে শুরু করে দিলাম। যাতে বেশ বড় মাপের একজন ফোটোগ্রাফার হিসেবে নিজেকে তুলে ধরা যায়।
ভদ্রমহিলা আমার কাছে এসে দাঁড়ালেন। তারপর আমাকে অবাক করে জিজ্ঞেস করলেন, “কাটা তো নেহি?”
বুঝলাম উনি জানতে চাইছেন, ওই দুই পালোয়ান কুকুরদ্বয় আমাকে কামড়েছে কিনা?
হেসে জানালাম, “জি নেহি।”
“টু্রিস্ট? বাঙ্গালি? কলকাত্তা?”
ট্যুরিস্ট শব্দটিতে আমার আপত্তি আছে। কারণ আমি আগমার্কা বাঙালি ট্যুরিস্ট নই। কিন্তু ওনাকে সেটা বুঝিয়ে লাভ নেই। উনি জানেন এই গ্রামে সাধারণত বাঙালি ট্যুরিস্টরাই আসেন। আপেল বাগানের শোভা উপভোগ করতে। সেলফি তুলতে। গাছের ঝুলন্ত আপেল হাতে ধরে পাউট করে ছবি তুলতে। ফোটো সেশন শেষ হলে তাঁরা হাত নেড়ে চড়ে যান। কেউ কেউ আবার আনন্দের অতিশয্যে লুকিয়ে আপেলও ছিঁড়ে নেন। গোদা বাংলায় যাকে বলে চুরি। আর ঠিক এই কারণে সব বাঙালি পর্যটককে কিন্নরের আপেল বাগান মালিকরা এক ঝটকায় চোর হিসেবে দেগে দেন। এই বদনাম ঘোচানো খুব মুশকিল।

দেশের প্রান্তিক গ্রামে দাঁড়িয়ে থাকার রোমাঞ্চটাও উপরি পাওনা। ওনাকে বললাম, “হুম, ঘুরতেই এসেছি। আর প্রাণ ভরে ছবি তুলতে। তবে আপনার দুই তাগড়াই পাহাড়াদার সেই সুযোগ আর দিল কই?”
উনি জানালেন,আপেল বাগান ঠিকাদারকে লিজ দেওয়া আছে। আপেল চুরি গেলে ঠিকাদার কথা শোনাবে। তাই কুকুর পোষা। এটাই এখানকার দস্তুর। তারপর চোখে মুখে উদ্বেগ প্রকাশ করে বললেন,“ভাগ্যিস কামড়ায়নি।”
মনে মনে ভাবলাম,কামড়ালে আর দেখতে হতো না। এখানে অ্যান্টি র‍্যাবিস
(Anti Rabies) ইনজেকশন তো দূর কি বাত। একটা ওষুধের দোকান পর্যন্ত নেই। কল্পাতেও পেতাম না। ছুটতে হতো সেই রেকংপিও। অবশ্য ওই দু’ই পালোয়ানের কামড় খেলে ভ্যাক্সিন (vaccine) নেওয়ার প্রয়োজন থাকতো না। বেঁচে থাকলে তবে তো অ্যান্টি র‍্যাবিসের অ্যাম্পুল কেনার প্রশ্ন ওঠে।

মালকিনের নাম চন্দ্রকান্তা। বেশ রাজকীয় নাম। তাঁর চার ছেলে ও এক মেয়ে। চার ছেলে মিলে ক্ষেতিবাড়ি করে। তার মানে সেই রাজকন্যা যাকে আমি দুর্গের অন্তরালে চলে যেতে দেখেছি সে ওনার মেয়ে। যে এক ডাকে দুই পালোয়ান কুকুরকে ফিরিয়ে নিয়ে গেছিল তার দুর্গের চত্বরে। ইস, যদি একবার অন্তত ঋণ স্বীকারের সুযোগ পেতাম! ভাগ্য আমায় সে সুযোগ দেবে কি?


#ছবি: রোঘি গ্রামে এলিয়ে থাকা হেমন্তের বেলা।

Comments

Popular posts from this blog