আপেলনামা 
          
কিন্নরের রয়্যাল আপেল আর গোল্ডেন আপেলের জগৎজোড়া খ্যাতির কথা তো অনেকেই জানেন। ওই আপেল এদিকে আসে না। প্রায় সবই বাক্স বন্দি হয়ে বিদেশে পাড়ি দেয়। রয়্যাল আপেলের গায়ে রক্তিম আভা। আর গোল্ডেন আপেলের গায়ে হলুদ আভা। অনেকটা মুসম্বির রং। কিছু গোল্ডেন আপেল আবার কাঁচা অবস্থায় পেয়ারার মতো লাগে। তবে আকার বা শেপটা আলাদা।
এই গোল্ডেন আপেলের কথা কিন্তু গ্রীক পুরাণেও উল্লেখ আছে। জনশ্রুতি, ট্রোজেন যুদ্ধ ও ট্রয় নগরী ধ্বংসের পিছনেও নাকি ছিল সেই সোনালি আপেলের ভূমিকামনে পড়ছে , ‘হেরা’, ‘অ্যাথিনা’ ও অ্যাফ্রোদিতের মধ্যে কে বেশি সুন্দরী সেই কাহিনি? সেই যে অলিম্পাস পর্বতে বীর প্যালেয়াসের সাথে জলদেবী থেসিসের বিয়ে। আমন্ত্রিত সব দেবদেবী শুধু বাদ দেবী এরিস। সেই ঘটনায় প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়ে হেসপেরিদাসের বাগান থেকে একটি সোনালি আপেল নিয়ে আসেন দেবী এরিসএরপর সোজা বিয়ের মণ্ডপে গিয়ে ছুঁড়ে মারেন সেই আপেল। সেই আপেলের গায়ে লেখা ছিল “ সব চেয়ে সুন্দরীর জন্য”। ব্যস,দেবতা জিউসের কাছে সেই আপেল দাবি করে বসেন তিন দেবী ‘হেরা’, ‘অ্যাথিনা’ ও ‘অ্যাফ্রোদিতে’তারপর কত কাণ্ড! 
                               গাছ ভর্তি কিন্নরের গোল্ডেন আপেল।

                               এবার বাজারে বিক্রির জন্য বাক্স বন্দি করা হচ্ছে।

হেসপেরাইডিসদের কাছ থেকে হারকিউলিসের সোনার আপেল নিয়ে আসার গল্পটা মনে পড়ছে? হারকিউলিস জানতেন না কোথায় সেই আপেল পাওয়া যাবে। তিনি হেসপেরাইডিসদের পিতা অ্যাটলাসের কাছে গেলেনঅ্যাটলাস তখন দু’হাতে আকাশ ধরে রেখেছিলেন। তিনি হারকিউলিসকে আপেলের ব্যবস্থা করে দেবেন বলে ভরসা জোগালেন। হারকিউলিস প্রস্তাব দিলেন, যতক্ষণ না পর্যন্ত অ্যাটলাস  সোনালি আপেল খুঁজে পান ততোক্ষণ তিনি আকশের ভার বহন করবেনঅ্যাটলাস যখন দেখলেন, এই আকাশের ভার বহন করার মতো কঠিন কাজ থেকে মুক্তি পাওয়ার একটা পথ পাওয়া গেছে  তখন তিনি রাজি হয়ে গেলেন। হারকিউলিসের কাঁধে আকাশ চাপিয়ে দিয়ে তিনি গেলেন আপেল খুঁজতে। নিয়েও এলেন। এসে বললেন যে, তিনি নিজেই ইউরেন্থিউয়াসের কাছে আপেল পৌঁছে দেবেন। হারকিউলিস বুঝলেন তিনি ফেঁসে গিয়েছেন। অ্যাটলাস তাঁর কাঁধে আকাশের ভার সঁপে দিয়ে পালানোর ফন্দি আঁটছেন। অ্যাটলাসকে তিনি বললেন, “বেশ ঠিক আছে,তুমিই দিয়ে এসো। শুধু একটু সময়ের জন্য তুমি আকাশটা ধরবে?  আমি কাঁধে কাপড় বেঁধে নিই, যাতে ঘাড়ে করে আকাশের ভার বইতে পারি।”
হারকিউলসের প্রস্তাবে অ্যাটলাস রাজি হয়ে বললেন, “ঠিক আছে তুমি কাঁধে কাপড় বেঁধে নাও আমি ততক্ষণ ধরছি। আর এই আপেলটা ধরো তো 
হারকিউলিসের ফাঁদে পা দিয়ে যেই না আকাশের ভার অ্যাটলাস নিজের কাঁধে নিয়েছেন অমনি আপেল নিয়ে ধাঁ হয়ে গেলেন হারকিউলিস।

                                    গাছ ভর্তি কিন্নরের রয়্যাল আপেল।

গ্রীক পুরাণে কাহিনির শেষ নেই। যাই হোক আবার ফিরে আসি কিন্নরের আপেল প্রসঙ্গে। কিন্নরের রয়্যাল আপেল স্বাদ,বর্ণ বা গন্ধের নিরিখে গোটা পৃথিবীতে সেকেন্ড বয়/গার্ল হিসেবে পরিচিত। আমি যতদূর জানি প্রথম স্থান ধরে রেখেছে নিউজিল্যান্ডের রয়্যাল আপেল।
এছাড়া একধরণের ছোট আপেল হয়। সেগুলিকে বলে ‘খাট্টা আপেল’এই খাট্টা আপেল গোল্ডেন আপেল প্রজাতির হলেও আকারে হয় ছোট। এবং খেতে মিষ্টি বা সুস্বাদু নয়। কামড় দিলে টক টক লাগে। তাই একে বলে খাট্টা আপেল। একথা যাঁরা কিন্নর গিয়েছেন তাঁরা জানেন। হয়ত খাট্টা আপেল খেয়েও দেখেছেন খোলা বাজারে এই খাট্টা আপেলের চাহিদা নেই বললেই চলে। আমাদের বাংলা মুলুকে অবশ্য ও জিনিস এসে পৌঁছোয় না। কিন্নর প্রদেশের মানুষজন ওই খাট্টা আপেল দিয়ে চাটনি, আচার এমন কি জ্যাম জেলিও বানান। যেমন ধরুন আমাদের এখানে কাঁচা আম দিয়ে ঘরে ঘরে মা,ঠাকুমা,দিদিমারা যেমন আমতেল বা আমের আচার বানিয়ে রাখেন তেমনটা  আর কি। কিন্নর প্রদেশের বাসিন্দাদের প্রায় প্রত্যেকেরই আপেলের বাগান রয়েছে। সেগুলো ঠিকাদাররা লক্ষ লক্ষ টাকায় লিজ নিয়ে নেন বছরভরের জন্য। ওই গাছের আপেলে বাগান মালিকও হাত দিতে পারবেন না। অর্থাৎ বাগান আপনার কিন্তু আপেল ঠিকাদারের। তবে কিছু আপেল গাছ কিন্নরের বাসিন্দারা লিজ দেন না। রেখে দেন নিজেদের জন্য। এই আপেল বাগানের মাঝেই রয়েছে খাট্টা আপেলের গাছ। সেই আপেলের আকার একটু ছোট সাইজের হয়। অক্টোবর মাসে দ্রুত ঠান্ডা পড়তে শুরু করে। নভেম্বর বা ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত মোটামুটি গোটা কিন্নর প্রদেশের অধিকাংশ জায়গায় বরফের রাজত্ব। তাই হেমন্তের সময়টা ওখানকার মানুষ গোটা শীতের মরশুমের জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছু স্টোর করতে শুরু করেন। তাতে যেমন থাকে জ্বালানির কাঠ, তেমনই থাকে দৈনন্দিন রেশন। হেমন্তের মরশুমে কিন্নরের ঘরে ঘরে আপেল বোঝাই থাকে কারণ,সেপ্টেম্বর থেকে আপেলের ভারে গাছ প্রায় নুইয়ে পড়ার জোগাড়পাহাড়ি গ্রামগুলোর বাসিন্দারা ঘরোয়া পদ্ধতিতে তৈরি করেন আপেল ওয়াইন। বিক্রির জন্য নয়,নিজেদের খাওয়ার জন্য। প্রচন্ড শীতে আপেল থেকে তৈরি সুরা পান করলে শরীর গরম থাকে। আর খাট্টা আপেল থেকে তৈরি চাটনি,আচার,জ্যাম,জেলি তো ঘরে ঘরেই তৈরি হয়। সেই খাট্টা আপেল প্রথমে রোদে শুকিয়ে নিতে হয়। যেমন আমরা বাজার থেকে কাঁচা আমলকি এনে রোদে শুকিয়ে নিই। কিম্বা টোপা কুল এনে ছাদের রোদে ফেলে রাখি। ঠিক তেমনই কিন্নর প্রদেশের গ্রামগুলোর বাড়ির ছাদে ছাদে খাট্টা আপেলের মেলা। হলুদ ও সবুজ আভার খাট্টা আপেল হেমন্তের রোদ মেখে শুকোতে থাকে। রোদে শুকিয়ে এক সময় শক্ত আখরোটের মতো চেহারা হয়ে যায়। আর কিন্নরের সুস্বাদু রয়্যাল ও গোল্ডেন আপেল ঠিকাদারের হাত ঘুরে এসে পৌঁছোয় শহুরে আড়তদারদের কাছে। তরপর তা জামাকাপড় পরে পাড়ি দেয় বিশ্বের নানা প্রান্তে। শেষে বলি, যাঁরা কিন্নরের রয়্যাল বা গোল্ডেন আপেল খেয়েছেন তাঁরা জানেন তা কী জিনিস! এক কামড় বসালেই জীবনের ফল্গু ধারায় উচ্ছ্বল মন্দাকিনী বইতে শুরু করবে।

                             বাজারে যাওয়ার আগে ঝুড়ি ভর্তি রয়্যাল আপেল।





Comments

Popular posts from this blog