পাহাড়ের মাথায় এক দুর্গের গল্প।
সুমদো থেকে টাবো হয়ে যে রাস্তাটা কাজা চলে গেছে সেই রাস্তা ধরেই ছুটছিল গাড়ি। ক্রমশ পিছনে সরে যাচ্ছিল  হিমালয়ের অজন্তা টাবো।  রাস্তা খারাপ নয়,জানলার কাচ দিয়ে দেখছিলাম এক রূপকথার রাজ্য সরে সরে যাচ্ছে। এক এক জায়গায় রুক্ষ ন্যাড়া পাহাড় গড়াতে গড়াতে নেমে এসেছে নীচের দিকে। আর সেই রুক্ষ উপত্যকা চিরে বয়ে গিয়েছে রূপসী স্পিতি নদী। একেবারে টার্কিশ ব্লু রঙের জল। তার রূপের ছটা নেশা ধরিয়ে দেয়। আহা জলের শরীরেও এমন রং ধরাতে পারে স্পিতি উপত্যকার আকাশ। যেন কোন যুবতীর শাড়ির আঁচল বিছিয়ে রাখা এই রুক্ষ প্রান্তর জুড়ে
                         স্পিতি নদী।

কাজা যাওয়ার পথে ২৪ কিলোমিটার আগে সিচলিং থেকে ডান দিকে একটা রাস্তা খাঁড়া উঠে গেছে পাহাড়ের ওপর। সে পথে আট কিলোমিটার গেলেই ধানকার। কিন্তু সিচলিং আমার পথ আগলে দাঁড়াল। চালক বাবাজিকে বললাম,“থোড়া রুকিয়ে ইধর।”

চালকের এই জনমানবহীন প্রান্তরে থামার আদৌ যে ইচ্ছে ছিল না তা তার মুখ দেখেই বুঝতে পারছিলাম,কিন্তু সওয়ারি লক্ষ্মী। আর এই ক’দিনে তিনিও বুঝে গিয়েছেন যে, এক পাগল আদমীর পাল্লায় তিনি পড়েছেন। ফলে নিমরাজি হয়েও গাড়ির গতি কমাতে কমাতে তিনি বলে উঠলেন, “ইধর কুছ নেহি দাদা ক্যায়া দেখনা।?”
তাকে কি করে বোঝাই যে সিচলিং আমাকে নিশির ডাকের মতো ডাকছে। গাড়ি থামতেই নেমে পড়লাম। এবং তলিয়ে গেলাম স্পিতির প্রেমে। ভেসে গেলাম।
                           সিচলিং
                         সিচলিং
আশ মিটিয়ে ছবি টবি তুলে খাড়া পথে গাড়ি ছোটালাম। এবার সিধা ধানকার। ধানকার আসলে একটি ছোট্ট রুক্ষ গ্রাম। আর বিখ্যাত ধানকার মনাস্ট্রির জন্য। টাবো থেকে ধানকারের দুরত্ব পড়ে বাইশ কিলোমিটার।
একটা সময় এসে নামলাম ধানকার মনাস্ট্রির গেটে। এই মনাস্ট্রিটা পরে তৈরি করা হয়েছে। তাই এটাকে নতুন ধানকার মনাস্ট্রি বলে। নতুন মনাস্ট্রি চত্ত্বর পেরিয়ে সোজাসুজি তাকালেই দেখা যায় পাহাড়ের ওপর বিপজ্জনক ভাবে ঝুলে থাকা হাজার বছরের প্রাচীন পুরনো ধানকার গুম্ফাকে। 
ধানকার।
                                  ধানকার নতুন মনাস্ট্রি চত্ত্বর।
                         ধানকার মনাস্ট্রির গেস্ট হাউজ।
নতুন মনাস্ট্রি চত্বরে একটা গেস্ট হাউজ আছে। বেশ সুন্দর। একেবারে পাহাড়ের গায়ে। এখানে থাকা এবং খাওয়ার ব্যবস্থা আছে পর্যটকদের জন্য। বৌদ্ধ লামারাই এই গেস্ট হাউজটি পরিচালনা করেন। এছাড়া ধানকার গ্রামে অল্প কয়েকটি হোমস্টে আছে থাকার জন্য। তবে থাকার পক্ষে মনাস্ট্রির গেস্ট হাউজটি বেশি ভালো। এক্কেবারে পাহাড়ের গায়ে যেন ঝুলছে। ছাদে এসে দাঁড়ালে সামনে স্পিতি নদীর বাঁক। দূরে পিন উপত্যকার ভাঁজগুলো দেখা যায়। আর ডান দিকে হাজার বছরেরও বেশি প্রাচীন ধানকার গুম্ফা। এ জায়গায় না থাকলে জীবন বৃথা। ঘর মিলে যেতেই বডি ফেলে দিলাম। গেস্ট হাউজেই একটা রেস্তোরাঁও আছে। ফলে খাওয়াও জুটে গেল।  
                           ধানকার গ্রাম।
                      এক সময় পাহাড়ের মাথায় এখানেই ছিল ধানকার দুর্গ।

স্পিতি উপত্যকার শীতল মরু গ্রাম ধানকার। উচ্চতা বারো হাজার সাতশ চুয়াত্তর ফুট। এখানেই এসে মিশেছে স্পিতি এবং পিন নদী। তাই দুই নদীর সঙ্গমস্থলও এই ধানকার। এই গ্রামে মাত্র আটষট্টিটা পরিবারের বাস। জনসংখ্যা তিনশ। বহুদূর থেকেই দেখা মেলে প্রাচীন ধানকার মনাস্ট্রির  গোটা বিশ্বের কাছে এই গুম্ফা একটি দ্রষ্টব্য স্থান। সেই কারণে বহু ভিনদেশি পর্যটক এখানে ছুটে আসেন। স্পিতি উপত্যকার প্রাচীন গুম্ফাগুলির মধ্যে ধানকার গুম্ফা অন্যতম। দূর থেকে দেখলে মনে মনে হবে একটা মস্ত উঁইয়ের ঢিঁপি বুঝি দাঁড়িয়ে আছে। এই বুঝি খসে পড়ল বলে। আসলে পুরোটাই প্রকৃতির সৃষ্টি। রুক্ষ পাহাড়ের গায়ে হাওয়া বয়ে বয়ে পাথর খয়ে গিয়ে এই অদ্ভুত আকৃতি নিয়েছে। ধানকারের এই আকৃতিই বৈশিষ্ট।
                         প্রাচীন ধানকার গুম্ফা। দেখলে মনে হয় উঁইয়ের ঢিপি। 
 হিমেল হাওয়া বয়ে বয়ে খয়ে গিয়েছে পাহাড়। অদ্ভুত এক আকৃতি নিয়েছে।

সপ্তদশ শতকে এই ধানকারই ছিল স্পিতির রাজাদের রাজধানী। নোনোজ রাজারা এক সময় এখানে রাজত্ব করেছেন। নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে পাহাড়ের মাথায় দুর্গও তৈরি করেছিলেন তাঁরা। ১৯৭৫ পচাত্তর সালের ভুমিকম্পে সে দুর্গ ধুলিসাৎ হয়ে যায়।  বর্তমানে অবশ্য স্পিতির সদর শহর কাজা। তিব্বতি ভাষায় ‘ধাং’ শব্দের অর্থ উঁচু বা খাড়া পাহাড়। আর ‘কার’ শব্দের অর্থ দুর্গ। অর্থাৎ খাড়া পাহাড়ের মাথায় দুর্গ। তাই ধাংকার বা ধানকার। ইংরেজিতে বলা হয়, “Fort on a cliff.” হাজার বছর আগে যা কিনা তৈরি হয়েছিল মাটি পাথর ও কাঠ দিয়ে।
      দুর্গের কৌশলগত অবস্থানই শত্রুপক্ষকে ঘায়েল করে ছাড়ত।


স্পিতির মানুষ যুদ্ধবাজ নন। তাঁরা বরাবরই শান্তিপ্রিয়। ফলে সবসময়ই কুলু,বু্শাহার এবং লাদাখের রাজারা সফট টার্গেট করে এসেছিলেন ধানকারকে। প্রায়শই এই ধানকারে আক্রমন শানাতো বাইরের শক্তি। তখন এখানকার মানুষ প্রাণ বাঁচাতে অন্যত্র চলে যেতেন। প্রজাদের রক্ষা করতে নোনোজ রাজারা শলা-পরামর্শ করে ঠিক করলেন পাহাড়ের মাথায় একটি দুর্গ বানাবেন। দুর্গের পাশেই থাকবে ধর্মচর্চা কেন্দ্র। মাটি-পাথর ও কাঠ দিয়ে তৈরি হল দুর্গ। দুর্গের ভেতর থেকে বাইরে নজরদারি চালানো হতো। এবার যখনই বাইরের শত্রুরা এই ধানকারে হামলা চালাতো তখনই এখানকার মানুষজন পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে না তুলে সোজা ওই পাহাড়ের মাথায় দুর্গের ভেতর ঢুকে বসে থাকতেন। সেখানে মজুত রাখা থাকতো খাদ্যশষ্যও। আর দুর্গের প্রবেশ পথের সামনে জ্বালিয়ে দিতেন আগুন। ফলে শত্রুরা ওই খাড়া পাহাড়ের মাথায় দুর্গের ভেতর আর ঢুকতে পারতো না। এরপর শুরু হতো অপেক্ষা। কবে শীত আসবে তাঁর অপেক্ষা। সেই অপেক্ষা দীর্ঘ হওয়ার বিষয় এখানে নেই। এখানে বছরে সাত মাস বরফের শাসন থাকে। ফলে শীত আসতেই হামলাকারীরা বিপাকে পড়তেন। ওই প্রবল ঠান্ডায় খোলা আকাশের নীচে তাঁবু খাটিয়ে থাকাটা সুইসাইড করার সামিল হতো। তার ওপর টান পড়তো খাদ্য সামগ্রীর ভাঁড়ারে। ফলে প্রাণ বাঁচিয়ে পালানো ছাড়া তাদের কাছে আর কোনও পথ খোলা থাকতো না। প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে কার সাধ্য? ধানকারের মানুষ বিনা রক্তপাতে, বিনা অস্ত্রপ্রয়োগে এভাবেই দিনের পর দিন পরাজিত করে এসেছেন বহিঃশত্রুদের। নাকি বলা যায়, স্পিতির মানুষের কৌশলের কাছে বারবার হার মেনেছে যুদ্ধবাজ রাজারা?
            ধানকার গেস্ট হাউজের ছাদ থেকে দেখা যায় গোটা ধানকার গ্রাম।
হাওয়ার বেগ এই ছবি দেখলেই বোঝা যায়। গোটাটাই হাওয়ার দাপটে সৃষ্টি।
স্পিতি নদীর বাঁক। 
এক ফ্রেমে গোটা ধানকার গ্রাম ও মনাস্ট্রি।
পাখির চোখে ধানকার।

Comments

Post a Comment

Popular posts from this blog