প্রেম মন্দির,মথুরা।


          ব্রজভূমি, বানর সেনা ও ড্রিমগার্লের স্বপ্নেরা

ব্রজ কথার অর্থ গো-পালক। রাখাল শ্রীকৃষ্ণের জন্মস্থানকে তাই বলা হয় ব্রজভূমি। মথুরা নগরীর একসময় নাম ছিল মধুরাপুরী। যাদব রাজাদের রাজধানী ছিল এই মধুরাপুরী। কালক্রমে সেই মধুরাপুরী হয় মথুরা নগরী আর এই মথুরাকেই বলা হয় ক্যাপিটাল অব ব্রজভূমি। আসলে মথুরা আর বৃন্দাবন টুইন সিটি। দূরত্ব মাত্র ১৪ কিলোমিটার। দুই শহরে মন্দিরের সংখ্যা অগুনতি। এহেন ব্রজভূমিতে মন্দিরের সঙ্গে মন্দিরের টক্কর অনিবার্য। এ বলে আমায় দেখ তো ও বলে আমায় দেখ। তার মধ্যেও বাঁকে বিহারি,মদনমোহন ও লিঙ্গরাজ মন্দিরের খ্যাতি বেশি। এই মন্দিরগুলো রীতিমত ক্রাউড পুলার। কিন্তু ইদানিং সবাইকে টেক্কা দিয়ে এক নম্বর কাউড পুলারের তকমাটা ছিনিয়ে নিয়েছে ‘প্রেম মন্দির’।
                                          প্রেম মন্দিরের সিংহদুয়ার।

মন্দিরে জাঁকজমক দেখলে চোখ কপালে উঠবে। আর ভেতরের কারুকাজ ও বৈভব দেখলে সংজ্ঞা লোপ পাবার জোগাড়। বিশেষ করে সন্ধ্যা বা রাত্রে এই মন্দিরের সামনে এসে দাঁড়ালে চোখ ধাঁধিয়ে যায়। কয়েক মুহূর্ত পরপর মন্দিরের গায়ে পড়া আলোর রং পাল্টে যায়। ফলে মনে হয় যেন প্রতি মুহূর্তে রং পাল্টাচ্ছে মন্দির। জাস্ট হাঁ করে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কিছু করার থাকে না। ওই মায়াবী পরিবেশে দাঁড়িয়ে অনেকেই বলে ফেলেন, “সবই কৃষ্ণের লীলা।”
                                       প্রেম মন্দিরের অন্দরমহল।

                                          মন্দিরের ভেতর দ্যুতি ছড়ানো ঝাড়বাতি।

কৃষ্ণ নামে মোহিত হয়ে ব্রজভূমের ডাকসাইটে মন্দিরগুলোয় গিজগিজ করছে ভক্তকূল। সঙ্গে ঝোপ বুঝে কোপ মারছে ‘শিক্ষিত’ বানরের দল। শিক্ষিত এই কারণেই বললাম, ওই বানরের দল স্থানীয় দোকানদারদের খুব একটা বিরক্ত করে না। কিন্তু পুণ্যার্থীদের জুতো,চটি,চশমা,ব্যাগ,নিপুণ দক্ষতায় ছিনিয়ে নিয়ে গিয়ে ফ্যাসাদে ফেলে। খাবারের জন্য দিব্যি ব্ল্যাকমেলিংও করে। গোটা ব্রজভূমে বানরের সংখ্যা নেহাত মন্দ নয়। সংখ্যাটা দু’লক্ষ। টাইপ মিসটেক নয়, সংখ্যাটা দু’লক্ষই। আরও শুনলে অবাক হবেন এই বাঁদরের বাদরামি রুখতে উত্তরপ্রদেশ পুলিশকে রীতিমত ট্রেইনড হনুমান পুষতে হয়েছে। এবং ওই সমস্ত ডাকাবুকো হনুমানদের পে স্কেল আছে। পুলিসের স্নিফার ডগদের যেমন থাকে। কারণ ব্রজভূমে ভিভিআইপিদের আনাগোনা লেগেই থাকে। আম জনতাকে বানর সেনার উৎপাতে নাজেহাল হতে হলেও ভিভিআইপিদের ক্ষেত্রে তা হতে দেওয়া যায় না। তাতে সরকারের মুখ পুড়বে। আবার রামের বানর সেনাকে ব্রজভূমি থেকে উৎখাতও করা যাবে না। ফলে উপায়? ষন্ডাগণ্ডা হনুমান পোষা। তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে পাহারাদার বানানো। ভিভিআইপিরা ব্রজভূমে পা রাখলেই ব্ল্যাকক্যাট হনুমানেরা পজিসন নিয়ে নেয়। তারাই বাঁদরের দলকে চোখ রাঙিয়ে শান্ত রাখে। গোটা ব্রজভূমে বানরের সংখ্যা এমন হু হু করে বেড়ে চলেছে যে সরকারকে পর্যন্ত ভাবতে হয়েছে এদের বংশবিস্তার রোখার বিষয় নিয়ে। অর্থাৎ নির্বীজকরণ অভিযান ছাড়া গতি নেই। তাতে আবার আপত্তি আছে পরিবেশবিদ ও পশুপ্রেমীদের একাংশের। ব্রজভূমে বাঁদরের বাদরামী নিয়ে আম জনতার কাছে ঘোর অস্বস্তিতে স্বয়ং ড্রিমগার্ল। অবাক হচ্ছেন? আরে,ড্রিমগার্ল মানে বলিউডে তো একজনই আছেন। হেমামালিনী। ভাবছেন হেমামালিনীর সঙ্গে আবার এর কানেকশনটা কী? যাঁরা জানেন না তাঁদের উদ্দেশ্যে জানাই, মথুরার সাংসদ তিনি। নির্বাচনী প্রচারে এসে ভোট প্রার্থীদের নানা ধরণের প্রতিশ্রুতি দিতে হয়। ভারতবর্ষের গণতন্ত্রে এটাই দস্তুর। কিন্তু গত লোকসভা নির্বাচনে মথুরা কেন্দ্রে প্রার্থী হয়ে এসে হেমার প্রথম প্রতিশ্রুতি ছিল বানরের অত্যাচার কমাবেন। কী মুশকিল! ড্রিমগার্লের স্বপ্নেও তাহলে বানরেরা আসে! স্বপ্নে না হোক দুঃস্বপ্নে তো বটেই। বানরের ভোট দেওয়ার অধিকার নেই। কিন্তু মথুরা লোকসভা কেন্দ্রে ভোটের হাওয়া ঘুরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে বানর সেনার দল।

                         


Comments

Popular posts from this blog