রাখি পুরাণ
“রক্ষাকবচ” শব্দটা
অনেক সময়ই আমরা বলে ফেলি। কিন্ত এই রক্ষাকবচের ভেতরেই কি লুকিয়ে আছে রাখির জন্ম?
রক্ষাকবচ থেকে রক্ষাবন্ধন। যা কিনা বাঙালিদের কাছে হয়ে ওঠে রাখিবন্ধন। যদিও
রাখিবন্ধন সেই অর্থে বাঙালি সংস্কৃতির প্রাচীন উৎসব নয়। বরং বলা যায় এই উৎসব উত্তর
ভারত বা উত্তর পশ্চিম ভারতেই জনপ্রিয় ছিল। কেউ কেউ বলেন আর্যদের প্রভাবেই এই বঙ্গে
রক্ষাবন্ধন প্রচলিত হতে শুরু করে।
রাখি মানে এক পবিত্র
বন্ধন। সে ভাই বোনের সম্পর্ক হোক বা বন্ধুত্বের। অথবা ভেদাভেদ মুছে ফেলার। আসলে তো রাখি মঙ্গল
কামনায় এক পবিত্র বন্ধনের কথা বলে। শিশু পুত্র কৃষ্ণের মঙ্গল কামনায় মা যশোদা রাখি
পূর্ণিমার দিন পুত্রের হাতে রাখি বেঁধে দিতেন।
পুরাণেও কিন্তু এই
রাখির উল্লেখ আছে। তবে ভিন্ন ভাবে। স্বর্গে তখন অসুররাজ বলির দাপট। দেবতারা
কোণঠাসা। দেবরাজ ইন্দ্র তাঁর সমস্ত শক্তি দিয়ে লড়াই করেও বলির কাছে পরাজিত এবং
অপমানিত। ইন্দ্রের এই অপদস্ত হওয়াটা মোটেই মেনে নিতে পারেননি ইন্দ্রের স্ত্রী ইন্দ্রানী।
যদিও তাঁর নাম ছিল শচী। দেবরাজ ইন্দ্রের শচীকে বিয়ে করার পিছনেও পুরাণে দু’টি
কাহিনি অছে। একটি মত হল,শচীর রূপ ও শরীরী সৌন্দর্যের আবেদনে মুগ্ধ হয়ে ইন্দ্র বাকি
সুন্দরীদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে শচীকে বিয়ে করেছিলেন। কিন্তু আরেকটি মত হল, ইন্দ্র
শচীর বাবা পুলোমাকে খুন করে জোর করে শচীকে ভোগ করে বিয়ে করেছিলেন। দেবতাদের মধ্যে ইন্দ্রের
চরিত্র নিয়ে বরাবরই টানাটানি হয়ে এসেছে। ইন্দ্র ছিলেন একেবারে কালারফুল ক্যারেকটার।
নারী ও সুরার প্রতি তাঁর আসক্তির কথা জানতো গোটা অমরাবতী। ঋগ্বেদে উল্লেখ আছে,ইন্দ্র
এতো সোমরস পান করতেন যে তাঁর উদর একটি সোমরসের হ্রদে পরিণত হয়েছিল। অত্যধিক সোমরস
পানের ফলে তাঁর উদর সবসময় স্ফীত হয়ে থাকত। কিন্তু ইন্দ্র বীর,সুপুরুষ এবং ধনবান।
তাঁর ঐশ্বর্য ছিল প্রচুর। ফলে নারীরা তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হতেন স্বাভাবিক নিয়মেই।
ইন্দ্রের স্ত্রী শচী ছিলেন ঘরেলু টাইপ। স্বামী এবং সংসার নিয়ে থাকতেই তিনি পছন্দ
করতেন। ফলে অসুররাজ বালির কাছে নিজের স্বামীকে পর্যুদস্ত হতে দেখে তিনি আর স্থির
থাকতে পারেননি। সোজা চলে গিয়েছিলেন বিষ্ণুর দরবারে। বিষ্ণু তাঁকে একটি ছোট্ট রঙিন
সুতোর বালা দেন। সেই পবিত্র সুতোর বালা নিয়ে ফেরার সময় ইন্দ্রের সঙ্গে পথে দেখা হয়
শচীর। ইন্দ্র তখন জয়ের রাস্তা খুঁজতে দেবতাদের
গুরু বৃহস্পতির কাছে যাচ্ছিলেন।
শচী ইন্দ্রকে বলেন,অসুররাজকে
পরাজিত করার উপায় তাঁর জানা আছে। ভবিষ্যপুরাণ অনুযায়ী, শ্রাবণ মাসের পূর্ণিমাতে
বিষ্ণুর দেওয়া সেই সুতোর বালা স্বামীর
মঙ্গল কামনায় ইন্দ্রের হাতে পরিয়ে দেন শচী। তিনি ওই সুতোর বালাকে ‘রক্ষাকবচ’
হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। এরপরে ইন্দ্র অসুররাজ বলিকে পরাজিত করে অমরাবতীর দখল
নিয়েছিলেন। শচীর সেই রক্ষাকবচ থেকেই সম্ভবত পরবর্তী কালে রাখির জন্ম।
শুধু পুরাণ নয়,
মহাভারতেও এই রক্ষাকবচ বেঁধে দেওয়ার বিষয়টি লিখে গিয়েছেন ব্যাসদেব। শ্রীকৃষ্ণ
একবার রথের চাকার আঘাতে আহত হয়েছিলেন। তাঁর হাত থেকে রক্ত ঝরছিল। সেই সময় দ্রৌপদী
তাঁর শাড়ি ছিঁড়ে কৃষ্ণের ক্ষতস্থানে বেঁধে দেন। দ্রৌপদীর এই সেবায় মুগ্ধ হয়ে যান
কৃষ্ণ। তিনি দ্রৌপদীর প্রতি এক নিবিড় স্নেহের বন্ধন অনুভব করেন। এর অনেক পরে ধৃতরাষ্ট্রের
রাজসভায় দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ পর্বে কৃষ্ণ দ্রৌপদীকে চরম লাঞ্ছনা থেকে রক্ষা করতে
এগিয়ে আসেন। সে গল্প সবার জানা। অনেকের বিশ্বাস যে, মহাভারতের দ্রৌপদী আর কৃষ্ণের
এই স্নেহের বন্ধনই হিন্দু সমাজে রাখি বন্ধনের মূল সুত্র।

Comments
Post a Comment