।। এক টুকরো ইজরায়েল।।
 দোকানের সাইন বোর্ডগুলোর দিকে চোখ পড়তেই ঘাবড়ে গেলাম। এ কোন ভাষা রে বাবা? একটা অক্ষরও তো পড়তে পারছি  না। চারদিকে ভিনদেশি মানুষের ভিড়। এক তরুণির নীল চোখের দিকে চোখ পড়তেই ভাবলাম ঘুমের ঘোরে বিদেশ পাড়ি দিলাম নাকি? কিন্তু না! আমি তো দাঁড়িয়ে আছি ভারতেই। অথচ এখানে হোটেল,রেস্তোরাঁগুলোর সাইন বোর্ডে অদ্ভুত সব শব্দ লেখা। কেমন যেন হিজিবিজি। মানে উদ্ধার করা অসম্ভব। ইধর উধর ঘোরাঘুরি করে জানতে পারলাম এগুলো হিব্রু ভাষায় লেখা।
হিব্রু ভাষায় লেখা সাইনবোর্ড।
                            
হিব্রু, মানে এ পৃথিবীর প্রাচীনতম ভাষা। যে ভাষায় বাইবেলের ‘ওল্ড টেস্টামেন্ট’ রচিত হয়েছিল বলেই জানি। তিন হাজার বছরের প্রাচীন একটি ভাষা যা কিনা এখন কেবল মাত্র ইজরায়েলিরাই বলে থাকেন। মুখ্খুসুখ্খু মানুষ হিসেবে যতটকু জানি তা হল, হিব্রু ভাষায় বাইশটি বর্ণমালা আছে। আর এই ভাষায় ভাওয়েলের (Vowels) ব্যবহার হয় না। এবং হিব্রু ডান দিক থেকে বাঁ দিকে লেখা হয়। ইজরায়েলের সরকারি ভাষা হল হিব্রু। আমি যে পাহাড়ি গ্রামটিতে এসে পৌঁছেছি সেই গ্রামটির চারদিকে ইজরায়েলি ছোঁয়া। ভারতের মাটিতে গজিয়ে ওঠা একটুকরো ইজরায়েল। যদিও এই গ্রামটির পোশাকি নাম কাসোল। যা কিনা ভারতের মিনি ইজরায়েল নামেই খ্যাতি কুড়িয়েছে।

ইজরায়েলি খাবারের রেস্তোরাঁ।

পিঠে রুকস্যাক আর হাতে ক্যামেরা নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে এসে পৌঁছেছি কাসোলে। হিমাচলের কুলু বা মানালি থেকে সহজেই পৌঁছে যাওয়া যায় কাসোল। কুলুর ভূন্টার এয়ারপোর্ট থেকে একত্রিশ কিলোমিটার দূর আর মানালি থেকে পড়বে আশি কিলোমিটার। দিল্লি বা চন্ডিগড় থেকে মানালিগামী বাসে ভূন্টারে পৌঁছে ক্যাব ভাড়া করে বা বাস ধরে পৌঁছে যাওয়া যায় এই ইজরায়েলি গ্রামে।। মানালি থেকেও কুলু হয়ে পৌঁছে যাওয়া যায় এখানে। সব ক্ষেত্রেই জংশন পয়েন্ট ভূন্টার।
হিমাচলের কুলু জেলার পার্বতী নদীর তীরে এক ছোট্ট পাহাড়ি গ্রাম কাসোল। তবে একেবারে অজ পাড়া গাঁ নয়। দোকান বাজার ইন্টারনেট কাফে, মাল্টি কুইজিন রেস্তোরাঁ সবই আছে। কিন্তু শহরের হৈ হট্টগোল নেই। শান্তি আছে,নীরবতা আছে,স্বাধীনতা আছে যত্রতত্র ঘুরে বেড়ানোর। পার্বতী নদীর তীরে প্রকৃতি প্রেমী ও ব্যাকপ্যকার্সদের স্বর্গ এই সুন্দরী কাসোল। কাসোলে ঢুকতেই কাসোল বাজার পড়বে। দোকানপাট,হোটেল,রেস্তোরাঁ সব সেখানেই। পায়ে পায়ে হাঁটলেই বাজার এলাকা শেষ।
বাজার ছাড়িয়ে সোজা হাঁটলেই নিখাদ প্রকৃতি দু’হাত বাড়িয়ে আপন করে নেবে। বাজার এলাকাতেও হোটেল আছে। আবার নদীর ধারে প্রকৃতির কোলে থাকতে চাইলে তার ব্যবস্থাও আছে। অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় হলে ক্যাম্প করেও থাকতে পারেন। কাসোলে তাঁবুতেও রাত কাটাতে চাইলে অসুবিধে নেই। তারও দিব্যি ব্যবস্থা রয়েছে।

পার্বতী উপত্যকায় ছোট্ট গ্রাম কাসোল।

কাসোল গ্রাম।
কাসোলে ইজরায়েলিরা নিজেদের মতো করে বসতি গড়ে তুলেছেন। পাশাপাশি রয়েছেন হিমাচলিরাও। তাই এখানে মিশ্র সংস্কৃতি। তবে ইজরায়েলি সংস্কৃতির প্রভাব এখানে বেশ জোরদার। তাই স্থানীয়দের জীবনযাপনে ইজরায়েলি সংস্কৃতির প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। কাসোলে বছরভরই ইউরোপীয় পর্যটকদের ভিড় লেগেই থাকে। ফলে এখানে ইচ্ছে হলে চেখে দেখতে পারেন ইউরোপীয় খাবার। বাজার এলাকায় রয়েছে ইজরায়েলি খাবার দাবারের রেস্তোরাঁও।আসলে একটা সময় ইজরায়েলিরা পুরনো মানালি এলাকায় নিজেদের মতো করে থাকতে পছন্দ করতেন। সেখানে তারা বসতিও গড়ে তুলেছিলেন। কিন্তু মানালি কালে কালে জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে খ্যাতি কুড়োনোর পর সেখানে মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে। তখন শান্তিপ্রিয় ইজরায়েলিরা মানালি চত্ত্বর থেকে পাততাড়ি গোটান। বিকল্প জায়গার সন্ধানে ঘুরতে ঘুরতে তাঁদেরই মধ্যে কয়েকজন খুঁজে পান পার্বতী নদীর তীরে পাইনের জঙ্গল ঘেরা এই জায়গাটিকে। তারপর এই কাসোলেই গড়ে তোলেন তাঁদের বসতি। ইজরায়েলিরা স্বাধীনচেতা। গোষ্ঠীবদ্ধ ভাবে নিজেদের মতো করে বাঁচতে ভালোবাসেন। ইজরায়েলিরা কাসোলে আসতে শুরু করায় এই অঞ্চলের হিমাচলিরা দুটো পয়সার মুখ দেখেন। বাড়তে থাকে পর্যটন। অর্থ আসায় স্থানীয়দের জীবনযাত্রার মান বদলে যেতে শুরু করে। তাঁরাও খুশি হয়ে ইজরায়েলিদের আপন করে নেন। কিন্তু একই সঙ্গে এই এলাকায় বাড়তে থাকে নেশার রমরমা। হিপিরা নেশার টানে ছুটে আসতে থাকেন এই কাসোলে।

জরায়েলি তরুণী।


নেশাতুর।

কাসোল,বারসেনি,মালানা,তোশ প্রভৃতি গ্রামগুলোতে হিপিদের প্রভাব বাড়তে থাকে। প্রকাশ্যে চরস সেবনের নজির মেলে এই জায়গাগুলোতে। চরস বা হাসিসের চাষও হয় এই অঞ্চলে। উল্লেখযোগ্য,মালানাতে যে চরস মেলে তা নাকি বিশ্বের সেরা চরস। আর ঠিক সেই কারণেই এই অঞ্চল হিপিদের স্বর্গরাজ্য। কাসোল থেকে মালানার দূরত্ব একুশ কিলোমিটার। চরসের চাষ ভারতে নিষিদ্ধ। কিন্তু চরস প্রেমীদের কাছে এর চাহিদা বিপুল। আর মালানা গ্রামের মাটির গুণে চরসের কদর আকাশ ছোঁয়া। পুলিস প্রশাসন যে তা জানে না তা নয়। কিন্তু শত চেষ্টাতেও চরসের চাষ আটকানো যায়নি। ফলে এ অঞ্চলে নেশাতুর ভিদদেশিদের আনাগোনা দেখা যায় ভরপুর।
হার্ঘ সেই চরস পাতা।

মালানা গ্রামকে বলা হয় ভারতের মাটিতে একটুকরো গ্রিস। কেন? কারণ এই গ্রামের বাসিন্দাদের বিশ্বাস তাঁরাই গ্রিক সম্রাট অলেকজান্ডারের বংশধর। এই গ্রামের কতগুলো নিজস্ব নিয়ম আছে। বহিরাগতরা এই গ্রামে এসে সেই নিয়ম ভাঙলে জরিমানা দিতে হয়। মালানা এলে গ্রামবাসীরা আপনাকে স্বাগত জানাতে দ্বিধা করবে না। কিন্তু আপনি এই গ্রামের কোন কিছু স্পর্শ করতে পারবেন না। যেমন ধরুন গ্রামের মন্দিরে বহিরাগতদের ঢোকা নিষেধ। প্রণাম করতে হবে বাইরে থেকে। মন্দিরের দেওয়ালকেও স্পর্শ করা যাবে না। আবার ধরুন গ্রামের কোনও দোকানে গেছেন কিছু জিনিষ কিনতে, দোকানদার কিন্তু জিনিস আপনার হাতে দেবে না। পাছে ছোঁয়া লেগে যায় তাই সে আপনার কেনা জিনিসটি রাখবে সামনের কাউন্টারে। আপনাকে ওই জিনিসের দাম মেটাতে টাকা রাখতে হবে কাউন্টারেই। দোকানিকে স্পর্শ করা যাবে না। ভুলবশত ছোঁয়া লেগে গেলে তাঁকে স্নান করতে যেতে হবে। অবাক হলেও এটাই এই গ্রামের দস্তুর। এই নিয়ম মেনে চলতেই হবে। নাহলেই ফরমান অনুযায়ী আপনাকে দিতে হবে জরিমানা।
কাসোল ইজরায়েলিদের বসতি হলেও এখান থেকেই গিয়েছে বেশ কয়কটি ট্রেকিং রুট। তারমধ্যে অন্যতম হল,পিন-পাবর্তী পাস,সারপাস ও ক্ষীরগঙ্গা। যে কারণে ইংরেজিতে বলা হয়, Kasol is the Himalayan hotspot for backpackers. ফলে বহু ট্রেকার্স কাসোল আসেন ট্রেকিং-এর লোভে। আবার অনেকে আসেন এই নিখাদ প্রকৃতির সান্নিধ্যে ক’টা দিন কাটাতে।
তবে, সব কিছুকে ছাপিয়ে মুগ্ধ করে পার্বতী উপত্যকার এই ছোট্ট গ্রাম বা আধাশহরটির মনকাড়া রূপ। বরফ ঢাকা হিমালয়,একটানা বয়ে চলা দুরন্ত পার্বতী নদী,সবুজ মখমলি উপত্যকা,নীল আকাশ ছুঁতে চাওয়া পাইনের বন, কোনও এক অদৃশ্য জাদুজালে আটকে রাখে কাসোল। শহর থেকে পালাতে চাওয়া মন বাঁধা পড়ে যায় এই আদুরে প্রকৃতির কোলে। পার্বতী নদীর তীরে বসে থাকতে থাকতে কখন বেলা গড়িয়ে যাবে তা মালুমই হবে না। এই চরাচর জুড়ে নিঃশব্দের মাঝে শুধু একটানা নদীর গান শুনতে শুনতে হয়তো কেউ নিজেকেই খুঁজে পাবেন। কাসোলের অবহাওয়ার গুণে আপনিও হয়ত হিব্রুতে বলে উঠবেন, “শালোম”। মানে “শান্তি”।

(আধুনিক হিব্রু ভাষায় অবশ্য “শালোম’ শব্দটি ইজরায়েলিরা ‘হ্যালো’ বা ‘গুডবাই’ হিসেবেও ব্যবহার করে থাকেন।)

কাসোলের একগুচ্ছ ছবি দিলাম পরপর।



















Comments

Popular posts from this blog