অন্য বসন্ত

                          

সন্ধ্যাবেলা একটা শিরশিরে হাওয়া দিত। পাগল হাওয়া। সেই উল্টো-পাল্টা হাওয়ায় ভেতর দাঁড়ালে বুঝতে পারতাম ফাগুন কেমন আগুন জ্বালায়। সিলেবাস ভুলে যেতাম। নোট্সের খাতায় কতশত আঁকিবুকিতে ফুটে উঠত একটা মুখের আদল। সেই মুখ যাকে দোলের দিন ছোঁয়া যায়। কাঁপা কাঁপা শীর্ণ আঙ্গুলেরা সাহসের ডানায় ভর করত ওই একদিন। ওই একদিনই সমস্ত লক্ষণ রেখা পার করে দিত পাগল হাওয়ার দল। রোদ্দুরে উড়ে বেড়াতো ফাগের গুঁড়ো। দোল মানে তাকে ছোঁওয়ার পাসপোর্ট,ভিসা।  আবির ভরা কাঁপা হাত ছুঁয়ে দিত কাঙ্খিত গাল। কপালে লেপ্টে থাকতো পলাশ আগুন।  ভর দুপুরে মুকুল ভরা আম গাছের আড়াল থেকে কোকিল ডেকে উঠতো। আর সে সন্দেহের চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বলতো, “সত্যি বলছিস, আবির দিয়েছিস! রং মিশিয়ে দিসনি তো?”
হাতের মুঠো বাড়িয়ে দিতাম ওর দিকে। বলতাম,“আবির।আবির।মা কালির দিব্যি। তুই ছুঁয়ে দেখ।”


মোহে রং দে।
তখনও আমাদের এই মফসস্‌ল শহরটা কলকাতা হয়ে ওঠেনি। মাথা তুলে দাঁড়ায়নি ঢাউস শপিং মল। আকাশের মুখ ঢেকে দেয়নি বহুতল আবাসন। ফোর জি? না থ্রি জি? তা নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় আসেনি। তখনও আমাদের বেঁধে ফেলেনি মোবাইল নেটওয়ার্ক। ফেসবুক আর হোয়াটসঅ্যাপের পরিধিতে আবদ্ধ ছিল না বসন্তের হু হু করা প্রেম। কাঁপা কাঁপা হাতেই ফাউন্টেন পেনের নীল কালিতে লেখা ভালবাসার হাজারও চিঠি উড়তো বসন্তের পাগল হাওয়ায়। কতশত চিঠি হারিয়ে ফেলতো পিনকোড। সারারাত মোমবাতির শিখার মত কাঁপতো সেইসব যত্নে সাজানো অক্ষরমালা। যদি একবার ছুঁয়ে দেখে সেই অহংকারি হাত। বাবার সাইকেল ধার করে চষে ফেলা সেইসব পথ। রেল লাইনের পাশ দিয়ে ছুটে চলা রাস্তা। পথে আগুন ধরিয়ে দিত পলাশ,শিমুল,অশোক,কৃষ্ণচূড়া।
সেই পথেই কখনও কখনও কলেজ থেকে হেঁটে ফেরা তার সাথে। হয়তো বেখেয়ালেই তার হাত ছুঁয়ে যেত আমায়। সে তখন নোটস্-এর কথা বলছে। কিন্তু আমি অবাক বিস্ময়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকতামআমার হাই পাওয়ারের চশমার কাঁচে শুধুই মুগ্ধতা ছড়িয়ে পড়তোসেই মুগ্ধতা কী তাকে কোনদিন ছুঁতে পেরেছিল? জানি না। কিন্তু আমি সেই মুগ্ধতা নিয়ে বাড়ি ফিরতাম। পড়ার টেবিলে ছড়িয়ে রাখতাম সেই মুগ্ধতা। অ্যাকাউনটেন্সি,কস্টিং,ইনকামট্যাক্সের জটিল বাঁকগুলো চোখের সামনে আরও বেঁকেচুরে যেত।
আজও নিঃশব্দে বসন্ত আসে। ফাগের হাওয়া বয় হয়ত। সন্ধ্যাবেলার সেই শিরশিরে হাওয়াটা আর বয় না। নাকি বইলেও টের পাই না? এখন ক্ষণজন্মা শীতের পরেই হটাৎ শহরের তাপমাত্রা পয়তিরিশ ডিগ্রি ছুঁয়ে ফেলে। ফাল্গুনের দুপুরে কোকিল ডাকে লোকাল ট্রেনের সহযাত্রী বা অফিসের সহকর্মীর মোবাইলের রিংটোনে। মুকুল ভরা গাছগুলো সব হারিয়ে গেছে। রেল লাইনের পাশ দিয়ে ছুটে চলা কালো পিচের রাস্তা আজও আছে। শুধু পথের ধারের অশোক,পলাশ,শিমুল,কৃষ্ণচূড়াগুলো কংক্রিটের বহুতল হয়ে রং ছড়াচ্ছে। সেখানে এখন দোল নয়,হোলি খেলা হয়। ডিজে আসে। দানব সাউন্ড সিস্টেমে হার্ড রক বাজে। ভেজাল ভেষজ আবিরের গন্ধ আর বিয়ারের গন্ধ মিলেমিশে এক হয়ে যায়। রঙিন মুখের কত শত ছবি ওড়ে ফেসবুকের দেওয়াল জুড়ে। ফ্রেমে বাঁধা বসন্তের উল্লাস

সন্ধ্যাবেলার সেই শিরশিরে হাওয়া স্মৃতির দেরাজে তুলে রাখি। অন্য বসন্তের দিনে লিখতে ইচ্ছে করে নাইজিরিয়ার বোকো হারাম জঙ্গিদের কথা। যারা শিশুদের স্কুল থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে পণবন্দি করে রাখে। সিরিয়ার আই এস জঙ্গিদের কথা। যারা খেলাচ্ছলে কিশোরের গায়ে বেঁধে দিতে পারে টাইমার লাগানো বিস্ফোরক। আবার বিদ্রোহ দমণের নামে যৌথ বাহিনীর হামলায় দামাস্কাসে মারা যায় শয়শয়ে মানুষ। মাথায় ওপর বোমারু বিমান চক্কর কাটে। লক্ষ লক্ষ উদ্বাস্তু মানুষ মৃত্যুর চিবুক ছুঁয়ে দিন কাটায় খোলা আকাশের নীচে। লিখতে ইচ্ছে করে তালিবানদের কথা,যারা ধর্মের নামে এক কোপে ধড় থেকে মাথা নামিয়ে দিতে পারে। লিখতে ইচ্ছে করে কাশ্মীরের কথা। যেখানে নিয়ন্ত্রণ রেখার ওপার থেকে ছুটে আসে মর্টার। এপারের বাঙ্কার থেকে থেকে গর্জে ওঠে লাইট মেশিন গান। মাঝখানে পড়ে ছুটোছুটি করেন সীমান্তবর্তী গ্রামের মানুষগুলো। ঘরের দেওয়ালে গুলির দাগ। পিছনে পড়ে থাকে সাজানো সংসার। ভিটে মাটি ছেড়ে দিশেহারা মানুষগুলো ছুটতে থাকে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে। আরও একবার  তাঁরা 'রিফিউজি' হয় এই রঙিন বসস্তে।

Comments

Popular posts from this blog