।। জলপরীর গল্প।।

ভোরের আলো গায়ে মেখে জলের গভীর থেকে উঠে আসছে এক নারী। সিল্যুট ফ্রেম। অবয়বটুকু দেখা গেলেও সেই নারীর চোখ মুখ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। তার পিছনে পূব আকাশে তখন রঙের খেলা। ভোরের আলো ফুটছে। সিল্যুট সেই নারীর শরীর থেকে চুঁইয়ে পড়ছে জলের রেখা। জলের ওপর দিয়ে দিব্যি সে হেঁটে উঠে আসছে।

ভোর বেলা একটা নোনতা হাওয়া বয়। আরব সাগরের জল ছুঁয়ে ভেসে আসে সেই হাওয়া। চোখে মুখে নোনতা আদর লেপে দেয়। পাড়ে আছড়ে পড়ে একটানা জলস্রোত। একটা রিদম তৈরি করে। সেই হাওয়া আর বালুতটে আছড়ে পড়া জলের মুর্ছনার ভেতর কখন যেন সে ঘুমিয়ে পড়েছিল। হটাৎ তার চোখে মুখে জলের ছোঁয়া পেয়ে জেগে উঠল চালচুলোহীন সেই যুবক। চোখ মেলে আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবল, বৃষ্টি এলো নাকি? কই না তো। আকাশ তো বিলকুল পরিষ্কার। নীলের ওপর হাল্কা গোলাপী ও হলুদ আভা ছড়িয়ে রয়েছে। তাহলে চোখে মুখে জলের ছিটে কোত্থেকে এলো? বালির ওপর শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল সে। এবার উঠে বসল। সামনে তাকাতেই দেখল এক নারী। তার দিকেই তাকিয়ে আছে। ভোরের আলোয় যেন আরও রহস্যময়ী লাগছে সেই নারীকে। যুবক ভাবল সে স্বপ্ন দেখছে।

সেই রহস্যময়ী নারী এবার যুবকের কাছে এসে জিজ্ঞেস করল, “কি হল? তুমি এভাবে একা একা বসে কী ভাবছো?”

যুবক চোখ কচলে পাল্টা জিজ্ঞেস করল,“আপনি কে? এই এতো ভোরে এখানে একা একা ঘুরে বেড়াচ্ছেন কেন?”

খিলখিল করে হেসে সেই নারী বলে উঠল, “বা রে আমি তো জলপরী। রোজ ভোরে এখানে আসি। তুমি এখানে কী করছো শুনি?”

“ধুর! জলপরী না ছাই। ঠিক করে বলুন আপনি কে? কোথায় থাকেন? আমাকে চিনলেন কী করে?” গলা চড়িয়ে জিজ্ঞেস করে উঠল সেই যুবক।

“জানতাম তুমি বিশ্বাস করবে না। কিন্তু আমার কিছু করার নেই। আমি জলপরী। এটাই আমার পরিচয়। তোমরা মানুষরা বড় বেশি অবিশ্বাসে ভোগো। মোবাইলে পুরে দেওয়া সফট্‌ওয়ার প্রোগ্রামের মতো। একটু এদিক ওদিক কিছু ঘটলেই হ্যাং করে যাও।”

যুবক অস্বস্তি বোধ করতে থাকল। জিব দিয়ে ঠোঁট চেটে নিল একবার। ঠোঁটটা বড্ড শুকনো লাগছে তার। কি বলে মেয়েটা? জলপরী? এসব আবার হয় নাকি? মনে করার চেষ্টা করল গতকাল রাতে সে কি নেশা করেছিল? নোনতা হাওয়ায় অবিন্যস্ত চুলগুলোর ভেতর বার কয়েক আঙ্গুল চালিয়ে নিল সে। পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে জলপরীর একটা ছবি তুলতে গেল।

অমনি জলপরী যুবককে বাধা দিয়ে বলে উঠল, “উঁহু ছবি তোলা যাবে না। এটাই আমার শর্ত।”
“কেন ছবি তুললে কি হবে? আপত্তি থাকলে আলাদা কথা।?” কিছুটা রুক্ষ ভাবে কথাগুলো বলে উঠল যুবকটি।
"ছবি তুললেই আমি হাওয়ায় মিলিয়ে যাব। ফিরে যাব ওই সাগরের জলের গভীরে। এটাই দস্তুর। আমাদের ছবি তুলতে নেই।” দূর সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় জানাল জলপরী।

পিছনে ভোরের রঙিন আকাশ আর দিগন্ত বিস্তৃত সমুদ্র। যুবকটির খুব ইচ্ছে ছিল এই রহস্যময়ী নারীর একটা ছবি তোলার। কিন্তু সেটা হল না। মনে মনে যুবক আশাহত হলেও মুখে কিছু বলল না। মৃদু হেসে মোসাইলটা পকেটে ঢুকিয়ে রাখল।  

যুবকটিকে ওরকম স্থির ভাবে তার দিকে তাকিয়ে বসে থাকতে দেখে জলপরী নরম সুরে জিজ্ঞেস করল,“বললে না তো কোথায় থাকো ? এখানে কী করছো?”

জলপরীর দিকে অবিশ্বাসের চোখে তাকিয়ে যুবক আমতা আমতা করে জানাল,“আমি একটা দেশ খুঁজছি। আর একটা ধর্ম।”

“সে কি? তোমার দেশ নেই। ধর্ম নেই?” অবাক হয়ে প্রশ্ন করে জলপরী।

"না, এ দেশ আমার নয়। একটা নতুন দেশ খুঁজছি। আর একটা নতুন ধর্ম। যে ধর্মের রং নেই। লাল নেই,নীল নেই,হলুদ নেই,সবুজ নেই,গেরুয়া নেই। রামের নামে অযোধ্যা নেই, আল্লার নামে জেহাদ নেই।”

“তবে এ দেশে কী আছে?“ জলপরীর চোখে কৌতূহল।

সবই আছে। বিপুল ঐশ্বর্য আছে,চরম অভাব আছে। দান আছে,চুরি আছে,পাপ আছে, পুণ্য আছে,প্রেম আছে,যুদ্ধ আছে,ধর্ম আছে,অধর্ম আছে। শুধু মানুষ নেই।”

যুবকটিকে মাথা নীচু করে বসে থাকতে দেখে জলপরী জিজ্ঞেস করে উঠল,“সে কি? তোমাদের দেশের মানুষরা সব গেল কোথায়?”

“মানুষরা সব যন্ত্র হয়ে গেছে। সিগন্যাল দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এই যে আমি, আমিও সিগন্যাল দ্বারা নিয়ন্ত্রিত সিস্টেমের দাস। তাই আমি গাছেদের মতো মানুষ চাই। গাছেদের কোনও ধর্ম হয় না জানো তো? গাছেরা গাছেদের গলা কাটে না। দাঙ্গা করে না,খুন করে না,রেপ করে না। গাছেরা গাছেদের ভালোবাসে। দেখবে জোরে হাওয়া দিলে গাছেরা কেমন নুইয়ে পড়ে একে অন্যের গায়ের গন্ধ শোঁকে।” এক নাগাড়ে কথাগুলো বলে জলপরীর দিকে তাকাল যুবক।

জলপরী দু’হাত শূন্যে ডানার মতো মেলে ধরে বলল, “এরকম দেশ আছে তো। তুমি যাবে ?”
যুবক বলল,“আছে? কোথায়?”

জলপরি যুবকের দিকে দু’হাত প্রসারিত করে বলল,“চলো আমার সাথে। ওই জলের গভীরে যে দেশ আছে সে দেশ আমার। ওখানে কোনও ধর্ম নেই। ওখানে মাথার ওপর পাক খায় না বোমারু বিমান।ওখানে যুদ্ধের হুমকি নেই। ওখানে শিশুরা খিদের জ্বালায় কাঁদে না। ওখানে অ্যাসিড হামলায় যুবতীর মুখ বিকৃত হয় না। ওখানে উগ্র যৌনতা নেই। ওখানে স্কুল কিশোরী বাড়ি ফেরার পথে ধর্ষিতা হয়ে মুখ লুকিয়ে আত্মহত্যা করে না। ওখানে ধর্মের নামে পাড়ায় পাড়ায় দাঙ্গা হয় না।” কথা বলতে বলতে জলপরী ক্রমশ জলের কাছে সরে যাচ্ছিল। যুবকটিও উঠে দাঁড়িয়ে এগিয়ে যেতে থাকল তার দিকে। মনে মনে ঠিক করে নিল, সে ওই দেশেই যাবে। এ দেশ তার নয়।

সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে যুবকটি পকেট থেকে মোবাইলটা বের করল। ভাবল,এই যন্ত্রটার তো ওখানে কোনও দরকার হবে না। ওটাকে এই সাগর পাড়ে ফেলে গেলেই হয়। মোবাইলটা ছুঁড়ে ফেলতে গিয়ে হটাৎ তার মনে হল, যদি এটা স্বপ্ন হয়? তাহলে তো সব মিথ্যে হয়ে যাবে। আচ্ছা যা ঘটছে তা কি বাস্তব না জাস্ট একটা স্বপ্নই? মনে মনে যুক্তি সাজিয়ে নিজেকে একটু গুছিয়ে নিতে চেষ্টা করল যুবকটি।
জলপরী এগিয়ে চলেছে জলের দিকে। পিছন থেকে যুবকটি দেখল নোনতা হাওয়ায় তার চুল উড়ছে। ভোরের আকাশের ক্যানভাসে রহস্যময়ী নারীর এক সিল্যুট প্রতিচ্ছবি। যুবকের মনে হল, স্বপ্ন হলে তো ছবি ওঠে না। স্বপ্ন না বাস্তব প্রমাণ হয়ে যাক তবে। ছবি তো আর মিথ্যে বলে না। এই যুক্তি সাজিয়ে নিয়ে সে মোবাইল ক্যামেরার শাটারে আঙ্গুল ছোঁয়াল। মুহূর্তের মধ্যে ক্যাপচার হয়ে ডিসপ্লে স্ক্রিনে ফুটে উঠল রহস্যময়ী এক নারীর ছবি। সিল্যুট ফ্রেম। চোখ মুখ স্পষ্ট নয়। কিন্তু শরীরে অবয়বটুকু স্পষ্ট। আর ব্যাকগ্রাউন্ড জুড়ে নোনতা হাওয়া মাখা ভোর। ছবির কম্পোজিশন বলতে এইটুকুই।
একপলক ছবিটা দেখে মোবাইলটা সমুদ্রের তীরে ছুঁড়ে ফেলে দিল সেই যুবক। ছুঁড়ে ফেলার অভিঘাতে মোবাইলটা গোঁত্তা খেয়ে বেশ খানিকটা ঢুকে গেল বালির ভেতর। আর ঠিক সেই মুহূর্তে তার শরীরের প্রতিটি কোষে কোষে আশ্চর্য এক অনুভূতি ছড়িয়ে পড়তে থাকল। সমুদ্রের দিকে চোখ মেলে তাকাল সে। দেখল চারদিক সুনসান। কেউ কোথাও নেই। কোথায় গেল সেই রহস্যময়ী নারী? যুবকটি চিৎকার করে ডাকল, “কোথায় গেলে তুমি জলপরী?” সমুদ্র থেকে উঠে আসা ভেজা নোনতা হাওয়ায় ভেসে গেল তার চিৎকার। কোনও উত্তর এলো না।

অধৈর্য হয়ে যুবক ফের চিৎকার করে উঠল, “জলপরী! জলপরী, কোথায় তুমি? ”

জলের গভীর থেকে জলপরী চালচুলোহীন সেই যুবকের উদ্দেশ্যে বলে উঠল, “শর্ত ছিল তুমি আমার ছবি তুলতে পারবে না। তুমি শর্ত ভেঙেছো, তাই তোমাকে আর আমাদের দেশে নিয়ে যাওয়া যাবে না। তুমি সারা জীবন তোমার সেই স্বপ্নের দেশ আর ধর্মের খোঁজে হন্যে হয়ে ঘুরে মরবে।”


জলপরীর কথাগুলো যুবকটি শুনতে পেল কিনা তা বোঝা গেল না।

                                                     ***





Comments

Popular posts from this blog