হুক্কুস বুক্কুস-২
ছবিঃ হজরতবাল মসজিদ,শ্রীনগর।
পয়গম্বর হজরত মহম্মদের একটি 'কেশ' রাখা আছে শ্রীনগরের হজরতবাল মসজিদে। যাকে কাশ্মীরিরা বলেন, 'মুই-এ-মুকদ্দাস'। মধ্যযুগ থেকে সংরক্ষিত ওই পবিত্র স্মারক। ইসলাম ধর্মের মানুষদের কাছে হজরতবল অতি পবিত্র ধর্মস্থান। হোলি শ্রাইন। এবার সেই মসজিদ থেকে যদি 'মুই-এ-মুকদ্দাস' উধাও হয়ে যায়, তাহলে কী হতে পারে? ভাবছেন কল্পনা করছি। জমিয়ে একটি থ্রিলার লেখার প্লট। তাই তো?
কাশ্মীরিদের ধর্মীয় ভাবাবেগের সঙ্গে জড়িয়ে আছে হজরতবাল। শুধু তাই নয়, হিন্দু ও শিখ সম্প্রদায়ের মানুষরাও হজরতবাল-এ আসেন, ঘুরে যান। কিছুটা সময় কাটান এই দরগায়। হজরত মহম্মদের পবিত্র কেশ 'মুই-এ-মুকদ্দাস' রাখা থাকে একটি বাক্সে। সেটা প্রকাশ্যে আনা হয় নির্দিষ্ট দিনে কিছু রীতি মেনে। সেই 'মুই-এ-মুকদ্দাস' একদিন সত্যি উধাও হয়ে গিয়েছিল। গল্প নয়, সত্যিই উধাও হয়ে গিয়েছিল। এবং তার জেরে কাশ্মীরে জ্বলে উঠেছিল অসন্তোষের আগুন। সময়টা ১৯৬৩ সাল। তখন দিল্লির মসনদে জওহরলাল নেহরু। সে সময়ে তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ। ওই অবস্থায় নেহরু পড়লেন এক ভয়ঙ্কর ক্রাইসিসে। কাশ্মীর জ্বলছে। এবার কী হবে?
কাশ্মীরিদের ধর্মীয় ভাবাবেগের সঙ্গে জড়িয়ে আছে হজরতবাল। শুধু তাই নয়, হিন্দু ও শিখ সম্প্রদায়ের মানুষরাও হজরতবাল-এ আসেন, ঘুরে যান। কিছুটা সময় কাটান এই দরগায়। হজরত মহম্মদের পবিত্র কেশ 'মুই-এ-মুকদ্দাস' রাখা থাকে একটি বাক্সে। সেটা প্রকাশ্যে আনা হয় নির্দিষ্ট দিনে কিছু রীতি মেনে। সেই 'মুই-এ-মুকদ্দাস' একদিন সত্যি উধাও হয়ে গিয়েছিল। গল্প নয়, সত্যিই উধাও হয়ে গিয়েছিল। এবং তার জেরে কাশ্মীরে জ্বলে উঠেছিল অসন্তোষের আগুন। সময়টা ১৯৬৩ সাল। তখন দিল্লির মসনদে জওহরলাল নেহরু। সে সময়ে তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ। ওই অবস্থায় নেহরু পড়লেন এক ভয়ঙ্কর ক্রাইসিসে। কাশ্মীর জ্বলছে। এবার কী হবে?
কাজ শেষ হয়ে গেলে কাবাব দিয়ে কাশ্মীরি নান খেতে বেশ লাগে। বুলেভার্ড রোডে দু নম্বর ডালগেটের ঠিক উল্টো দিকে একটা রেস্তোরাঁ আছে। 'শামিয়ানা রেস্টুরেন্ট'। ভেতরটা বেশ সাজানো গোছানো। ভেতরে গিয়ে বসলে একটা বাদশাহি মেজাজ আসে। বাতানুকুল পরিবেশেও কাশ্মীরি খানার ভরপুর খুশবু। চিত্ত চঞ্চল করে দেয়। কাজের চাপে দুপুরে খাওয়া জোটেনি। বিকেলের দিকে নান আর শিখ কাবাব খেতে খেতে কথা বলছিলাম ইসমাইল দারের সঙ্গে। ইসমাইল আমার গাড়ির চালক। হাসিখুশি যুবক। আমার কপি লেখা এবং ছবি তোলার কাজ শেষ দেখে ইসমাইল বলল,"এখন আর ঘরে ঢুকে কী করবেন? চলুন ঘুরে আসি।"
এপ্রিলে কাশ্মীরে বসন্ত খেলা করে। চারদিক গাছপালা সবুজ। রঙিন ফুলের মেলা। কাশ্মীরিরা ফুলকে বলে 'পোশ'। 'পামপোশ' মানে পদ্ম ফুল। যা রাশিরাশি ফুটে থাকে ডাল হ্রদের জলে। টিউলিপ গার্ডেনে রঙের মেলা। ফুটে থাকে নানা রঙের টিউলিপ। লালচক,রেসিডেন্সি রোড,ডাউনটাউন যেখানেই যাই মাথায় হিজাব দেওয়া ডানা কাটা পরীরা সব ঘুরে বেড়ায়। বিকেলের দিকে ডালের জল ছুঁয়ে মন কেমন করা হাওয়ারা ছুটে আসে। কিন্তু তখন আমি কাবাবে মজে। চোখ বুজে আসছে। ঘুমে নয়, কাবাবের মখমলি স্বাদে। দিনভর তো কম চরকি কাটলাম না। এখন আবার কোথায় ঘুরতে যাবার কথা বলছে ইসমাইল? আর তাছাড়া এখানে আমার ঘোরার মতো কিছু নেই। কাজে-অকাজে কম বার তো কাশ্মীর হল না। "কোথায় আবার ঘুরব?" খানিকটা উদাস ভাবেই বলে উঠলাম।
"চলুন,একবার দরগা শরিফ ঘুরে আসি?"
'হজরতবাল?"
এক টুকরো নান আর কাবাব মুখে দিয়ে ইসমাইল ঘাড় নেড়ে বলল,"জি জনাব।"
মনে মনে ভাবলাম, আগে বার কয়েক গেছি ওখানে। দরগার ভেতরের পরিবেশটা ভালো লাগে। কিন্তু এখন যেতে ইচ্ছে করছে না। ইসমাইল কী ভাববে তাই নাও করতে পারছি না। জুম্মা বার কিনা মনে করার চেষ্টা করলাম। নাহ! আজ তো শুক্রবার নয়। শুক্রবারে দরগা মার্কেটে ব্যাপক ভিড় হয়। রাস্তার দু'ধারে রীতিমত দোকানের মেলা বসে যায়। তাছাড়া ওখানে গেলে আমার ওই বিশাল বিশাল পরোটা (একটার দাম ১০০টাকা।) আর হালুয়া দেখলে লোভ লাগে। খেতে ইচ্ছে করে। এখন পেটে জায়গা নেই। ইসমাইলকে সরাসরি না বললে আহত বোধ করবে। তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও ওকে বললাম, "চলো, চলতে হ্যায়।"
শ্রীনগরের ট্রাফিক ঠেলে কাশ্মীর ইউভার্সাটির গেটটাকে বাঁদিকে রেখে কিছুটা এগিয়ে ডান দিকে হজরতবাল রোড ধরলাম। ডালগেট থেকে দরগা একটু দূর আছে। দশ কিমি। মেরেকেটে অধ ঘন্টা লাগল।
দরগা অঞ্চলটা ঘিঞ্জি। এদিকটা বসতি এলাকা। ফলে ভিড়ভার রয়েছে। মসজিদের একটু দূরে গাড়ি পার্ক করে নেমে এলাম। মসজিদের সামনে হাজার হাজার পায়রা। কেউ কেউ সেই পায়রাদের দানা খাওয়াচ্ছে। হুস হুস করে পায়রাগুলো উড়ে যাচ্ছে। আবার পর'ক্ষণেই ফিরে আসছে। পায়রাদের রাজত্ব পেরিয়ে গিয়ে ঢুকলাম সাদা মার্বেলে তৈরি স্থাপত্যের ভেতরে। ডাল লেকের উত্তর পাড়ে হজরতবাল মসজিদ। মসজিদের অভ্যন্তরে শান্তির পরিবেশ। বাঁদিকে প্রশস্ত পথ দিয়ে বাইরে বেরিয়ে সোজা হাঁটা দিলাম পিছন দিকে। সেখানে তখন পাখিদের কিচিরমিচিরে কান পাতা দায়। পিছনের উদ্যানে অনেকেই পরিবার নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। অধিকাংশই ট্যুরিস্ট। ইসমাইল গিয়েছে দরগায় প্রার্থনা জানাতে। ইসমাইলকে বলেই এসেছি, "কোথায় আর উধাও হয়ে যাব? খুঁজে নিও আমায়।"
হজরতবাল মসজিদ থেকে 'মুই-এ-মুকদ্দাস' কী ভাবে উধাও হয়ে গিয়েছিল তা আজও রহস্য। হজরত শব্দটা ফার্সি। যার মানে 'সম্মানীয়" আর কাশ্মীরি ভাষায় 'বাল' শব্দের অর্থ 'জায়গা'। হজরত মহম্মদের কেশ উধাও হওয়া মানে কাশ্মীরিদের কাছে এক স্পর্শকাতর বিষয়। ১৯৬৩ সালের ২৭-এ ডিসেম্বর মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর। সেদিনই ঘটেছিল ঘটনাটা। নেহরু তখন অসুস্থ। হৃদরোগে আক্রান্ত তিনি। মরার ওপর খাঁড়ার ঘা-র মতো এই দুঃসংবাদ। মধ্যযুগ থেকে সংরক্ষিত এমন স্মারক উধাও হয়ে যাওয়া মানে ছেলে খেলা নাকি? এই একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে উপত্যকায় ছড়িয়ে পড়ল অশান্তির আগুন। 'কাশ্মীরিয়ত' সেই প্রথম অগ্নিপরীক্ষার সামনে। জেগে উঠল ধর্মীয় আবেগ। কাশ্মীরের রেশ গিয়ে পড়ল পূর্ব পাকিস্তানে (তখনও বাংলাদেশ হয়নি)। সেখানে শুরু হল হিন্দুদের ওপর অত্যচার। কাশ্মীরেও একই ছবি। আহত বোধ করলেন নেহরু। শেখ আবদুল্লা তখন জম্মুর জেলে বন্দি। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছোল যে, ৩১ শে জানুয়ারি ওই 'মুই-এ-মুকদ্দাস' খোয়া যাওয়া নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নেহরুকে বেতারের মাধ্যমে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিতে হল। গড়া হল আওয়ামি অ্যাকশন কমিটি। নিধন যজ্ঞ থামাতে নেহেরু লালবাহাদুর শাস্ত্রীকে কাশ্মীরে পাঠালেন। অসুস্থ বলে তিনি নিজে যেতে পারলেন না। কিন্তু উদ্বেগ তাঁর পিছু ছাড়ল না।
মিরাকল না যড়যন্ত্র জানা যায়নি। ১৯৬৪ সালের চৌঠা জানুয়ারি সেই পবিত্র স্মারক 'মুই-এ-মুকদ্দাস' এর হদিশ মিলল মসজিদের ভেতরেই। সাতদিনের জন্য কোথায় কী ভাবে মসজিদ থেকে উধাও হয়ে গিয়েছিল ওই পবিত্র স্মারক? তার উত্তর খুঁজে পাওয়া যায়নি। 'মুই-এ-মুকদ্দাস' এর খোঁজ মিললেও অশান্তি থামার নাম গন্ধ নেই। কারণ তখন প্রশ্ন উঠতে শুরু করছে ওই স্মারক আসল নয়,নকল। গুজব ছড়াল আগুনের মতো। কাশ্মীরে বসবাসকারী সংখ্যালঘুরা আতঙ্কিত হয়ে পড়লেন। সব পক্ষের সঙ্গে কথা বলে শাস্ত্রীজি ক'জন মুসলিম বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি টিম গড়লেন। সেই টিমের সদস্যরাই উদ্ধার হওয়া 'মুই-এ-মুকদ্দাস' কে দেখে রায় দিলেন,স্মারকটি আসল। ধীরে ধীরে শান্তি ফিরে এল কাশ্মীরে। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন উপত্যকার বাসিন্দারা।
আসলে নব্বই দশকের শুরুতে উপত্যকায় পণ্ডিত নিধন যজ্ঞ মারাত্মক আকার নিয়েছিল ঠিকই। কিন্তু এর বীজ লুকিয়ে ছিল সাতাশ বছর আগের ওই ঘটনায়। তখন থেকেই ফিকে হতে শুরু করেছিল 'কাশ্মীরিয়ত'। নব্বই দশকে যা পুরোপুরি খসে পড়েছিল। এবং তার জেরে একটা গোটা জাতি কাশ্মীর থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। লাখো লাখো মানুষের পিঠে পড়েছিল 'রিফিউজি'-র স্ট্যাম্প। আদতে সেটা ছিল,জেনোসাইড! গণহত্যা! যে ঘটনায় আজ অবধি কোনো শাস্তি কেউ পায়নি।

Comments
Post a Comment