হুক্কুস বুক্কুস-১  ৩৭০ ধারা বিলোপ। ফিরে দেখা কাশ্মীরের ইতিহাস।

সালটা ১৯৫২। দিল্লির মসনদে তখন কংগ্রেস। প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু। নেহরুর গলায় কাশ্মীর সমস্যা কাঁটার মতো বিঁধে। কাশ্মীর ভারতের সঙ্গে চুক্তি করে রাজ্য হলেও সমস্যা মেটেনি। কাশ্মীরের জনপ্রিয় জননেতা শেখ আবদুল্লা নেহরুর বন্ধু। আবদুল্লা তখন মুসলিম কনফারেন্স-এর মাথা। কাশ্মীর সমস্যা সমাধানে নেহরু অনেকটাই আবদুল্লার ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। আবদুল্লার সঙ্গে তাঁর নেহাত বন্ধুত্ব নয়,গড়ে উঠেছিল পারিবারিক সম্পর্কও। যে কারণে আবদুল্লা জেলে থাকার সময় নেহরু নিজে খোঁজ রাখতেন তাঁর পরিবারের। সে সময় আবদুল্লা পুত্র ফারুখ আবদুল্লা জয়পুরে ডাক্তারি পড়তেন। আর মজার ব্যাপার, শেখ আবদুল্লার অ্যারেস্ট ওয়ারেন্টে সই করেছিলেন খোদ নেহেরুই। ১৯৫৩ সালের ৯ অগস্ট রাতে আবদুল্লার অ্যারেস্ট ওয়ারেন্টে সই করেছিলেন নেহরু। ১০ অগস্ট সকালে গুলমার্গের এক সরকারি গেস্ট হাউজ থেকে গ্রেফতার করা হয়েছিল শেখ আবদুল্লাকে। বন্ধুকে জেলে পুরতে নেহরুর খারাপ লেগেছিল নিশ্চয়ই। কিন্তু নেহরুর কোনো উপায় ছিল না। আবদুল্লা সে সময় তলে তলে কাশ্মীরে গণভোট চাইছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তিনি নাকি পাকিস্তানের হাতে ক্রীড়ানক হয়ে পড়েছিলেন। যা কিনা আজও 'কাশ্মীর কন্সপিরেসি কেস' নামে খ্যাত হয়ে আছে।
তার ঠিক কয়েক বছর আগের কথা। ১৯৪৭ সালের ২৬ অক্টোবর মহারাজা হরি সিং কাশ্মীরের পক্ষে ভারতের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন নিরুপায় হয়ে। রাজা হরি সিং এর স্বপ্ন ধুলিসাৎ হয়েছিল। তিনি চেয়েছিলেন, দু'দেশের মাঝে কাশ্মীর থাকবে নিরপেক্ষ রাষ্ট্র হয়ে। তাঁর ধারণা ছিল না,পাক সেনার মদতে গেরিলারা ঢুকে দখল করতে চাইবে শ্রীনগর। শুধু তাই নয়, হরি সিং-এর বিরুদ্ধে কাশ্মীরে তখন বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল উপজাতিরা। সেই আন্দোলনকে হাইজ্যাক করে নিয়েছিল পাকিস্তান। 'কায়েদ এ আজম' মহম্মদ আলি জিন্না তখন কাশ্মীরকে নিয়ে ইসলামিক রাষ্ট্র গড়ার স্বপ্নে বিভোর। সে সময় কাশ্মীরের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন মেহেরচাঁদ মহাজন। হরি সিং এর নির্দেশে মহাজন ছুটেছিলেন দিল্লি। পাক হানাদারদের থেকে বাঁচতে ভারতের কাছে সেনা পাঠানোর আর্জি পেশ করেছিলেন তিনি। মহারাজা হরি সিং দলিলে সই করার পর শ্রীনগরে সেনা পাঠিয়েছিলেন নেহরু। কাশ্মীর ভারতের রাজ্য হওয়ার পিছনে কিন্তু অবদান ছিল শেখ আবদুল্লার। ইলাহাবাদে জন্ম গ্রহণ করলেও নেহরু আদতে ছিলেন কাশ্মীরি পণ্ডিত। তাঁর কাশ্মীরি আবেগকে কাজে লাগিয়েছিলেন শেখ আবদুল্লা। আবদুল্লা নেহরুকে বুঝিয়েছিলেন,কাশ্মীরের রাজার আবেদন মেনে শ্রীনগরে সেনা পাঠিয়ে সাহায্য করলে নেহরুর পিতৃভূমি পাকিস্তানের পরিবর্তে ভারতে আসবে। এর পরেই সেই ঐতিহাসিক চুক্তি এবং বিশেষ মর্যাদা দিয়ে কাশ্মীরকে ভারতের রাজ্য ঘোষণা।
১৯৪৮ এর পয়লা জানুয়ারি। নিউইয়র্কে বসেছিল রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদের অধিবেশন। আন্তর্জাতিক মঞ্চে কাশ্মীরের তখন টেনিস বলের মতো অবস্থা। ভারত ও পাকিস্থান দু'জনেই একটুকরো জমি নিয়ে টানাটানি করছে। রাষ্ট্রপুঞ্জ নিদান দিল,পাকিস্তান যেন উপত্যকায় আর হানাদার না ঢোকায়। আর ভারতকে বলা হল,জম্মু-কাশ্মীর থেকে ধীরে ধীরে সেনা সংখ্যা কমাতে। ওই বছরেরই মার্চ মাসে শেখ আবদুল্লা কাশ্মীরের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। তখনও রাজা ছিলেন মহারাজা হরি সিং। প্রধানমন্ত্রী হয়েই প্রগতিশীল ভূমিসংস্কারে নজর দিয়েছিলেন আবদুল্লা। সংঘাত বেঁধেছিল হরি সিং এর সঙ্গে। নেহরুও বিষয়টিকে ভালো চোখে নেননি। কারণ,আবদুল্লার এই সংস্কার নীতিতে সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন ডোগরা রাজপুত ও কাশ্মীরি পণ্ডিতরা।
১৯৫২ সালের অগস্ট মাসে সংসদের অধিবেশনে কাশ্মীর নিয়ে বিবৃতি দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী জওহললাল নেহরু। তিনি বলেছিলেন,"জনগণের ইচ্ছের বিরুদ্ধে সেনা পাঠিয়ে আমরা কাশ্মীর জয় করতে চাই না। কাশ্মীরের জনতা চাইলে আমাদের সঙ্গে নাও থাকতে পারেন। ভারত-কাশ্মীর জোর করে বিয়ের পক্ষপাতী আমি নই।"
নেহরুর কাশ্মীর নীতি নিয়ে সে সময় প্রতিবাদে মুখর হয়ে উঠেছিল ভারতীয় জনসংঘ। যা কিনা আজকের বিজেপি। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের হাতে গড়া এই দল সমালোচনায় মুখর হয়ে উঠেছিল কংগ্রেস সরকারের। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্ব দাবি উঠেছিল, এক দেশ এক,এক নিশান ও এক আইনের। ৩৭০ ধারা বাতিল ও কাশ্মীরকে ভারতের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবে ঘোষণার দাবি তুলেছিলেন তিনি।
আবদুল্লা বা নেহরু যে কাশ্মীর সমস্যা সমাধানে আন্তরিক ছিলেন না তা নয়। কিন্তু ১৯৪৭-এ তাড়াহুড়োয় করা চুক্তির কিছু ত্রুটি এমন জট পাকিয়ে গিয়েছিল যে তা থেকে বের হওয়ার কোনো দিশা পাচ্ছিলেন না নেহরু। আবদুল্লা কাশ্মীরকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চেয়েছিলেন ঠিকই কিন্ত তিনি উগ্র মৌলবাদে বিশ্বাস করতেন না। মহাত্মা গান্ধীর আদর্শে অনুপ্রাণিত আবদুল্লা ছিলেন ধর্মনিরপেক্ষ। ১৯৬৪ সালের ২৭ শে মে নেহেরুরু মৃত্যুর পর কাশ্মীর সমস্যা সমাধানের সব আশা নিভে গিয়েছিল। এরপর গত শতাব্দীর নব্বই দশকের শুরু থেকে উপত্যকায় শুরু হয়েছিল আন্দোলন। সেই আন্দোলনও হাইজ্যাক করে নিয়েছিল পাকিস্তান। কাশ্মীরি যুবকদের মস্তিষ্কে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল 'র‍্যাডিক্যাল রিলিজিওন'। ইসলামকে খুব চতুর ভাবে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছিল জেহাদের সঙ্গে। যার নিট ফল, গত তিরিশ বছরে উপত্যকায় সেনা,জঙ্গি ও সাধারণ মানুষ মিলিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা সত্তর হাজার।
আজকের বিজেপি সরকার সংসদে সংখ্যাত্ত্বের নিরিখে বলীয়ান। কাশ্মীর নিয়ে তারা সত্তর বছরের পুরনো একটি পাথর সরানোর মতো সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছে। যদিও এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, শুধুমাত্র মানচিত্র দিয়ে দেশ হয় না। দেশ হয় সীমারেখার মধ্যে বসবাসকারী মানুষদের নিয়ে। সেনা দিয়ে মানচিত্র দখল করা যায়। কিন্তু মানুষের মন নয়। আম কাশ্মীরিদের মধ্যে এই বিশ্বাস জাগিয়ে তুলতে হবে যে, তাঁরাও এই দেশের অংশ। এই দেশের ভালোমন্দের সঙ্গে তাঁদের ভাগ্যও জড়িয়ে রয়েছে। একদিকে কাশ্মীরের মানুষের আস্থা অর্জন, অন্যদিকে কাশ্মীরের উন্নয়ন-এই দুটোই এখন নতুন চ্যালেঞ্জ কেন্দ্রের সামনে। আর সেটা বন্দুকের নল দিয়ে করতে গেলে হিতে বিপরীত হবে। সেক্ষেত্রে ঝিলমের জলের রং লাল হয়ে গেলেও শান্তি ফিরবে না উপত্যকায়।

                                
                                          ছবিতে দেখা যাচ্ছে জওহরলাল নেহরু এবং শেখ আবদুল্লাকে।

Comments

Popular posts from this blog