।।সত্য যুগের প্রেম গাঁথা।।
রাজা হিমাবত তাঁর মেয়ের বিয়ে নিয়ে চিন্তায় পড়েছেন। মেয়ের মতিগতির ঠিক নেই। বিয়ের কথা বললেই মেয়ের সেই এক কথা- “শিবকে তিনি মন থেকে স্বামী হিসেবে মেনে নিয়েছেন। তাঁর পক্ষে আর অন্য কোনও পুরুষকে বিয়ে করা সম্ভব নয়।” বাবা হিসেবে হিমাবত মেয়েকে অনেক বুঝিয়েছেন যে, “এ সম্ভব নয়। তুমি অন্য কোনও পাত্রের কথা বলো আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করব সেই পাত্রের সঙ্গে তোমার বিয়ে দিতে।”
রাজকন্যার সেই এক গোঁ। “বিয়ে করব তো শিবকেই করব, নচেৎ আজীবন কুমারী থাকব।” জোরাজুরি করলে মন্দাকিনীর জলে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করার হুমকিও তিনি দিয়ে রেখেছেন বাবাকে।
হিমাবত জানেন মেয়ে পার্বতী গোঁ ধরলেও এ বিয়ে সম্ভব নয়। সদ্য সতীকে হারিয়ে শিবের তখন পাগলপারা দশা। ব্রহ্মা, বিষ্ণুও শিবকে কিছু বোঝাতে যেতে ভয় পাচ্ছেন। হিমাবত জানেন, এই পরস্থিতিতে  তাঁর মেয়েকে বিয়ে করার প্রস্তাব নিয়ে গিয়ে দাঁড়ালে শিবের রোষানলে পড়তে হবে তাঁকে। মেয়ে পার্বতীর ভবিষ্যত নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলেন তিনি। রাজধানী ত্রিযুগীনারায়ণে রয়েছে বিষ্ণুর মন্দির। তিনি সেই মন্দিরের সামনে উদাস ভাবে পায়চারি করতে থাকলেন। রাজা হলেও তিনি তো পিতা। মেয়ের প্রেম নিয়ে আপত্তি না থাকলেও এ প্রেম যে পূর্ণতা পাবে না সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত।
পার্বতী তাঁর লক্ষ্যে অবিচল। তিনি শিবের পূজারী হলেও মনে মনে শিবকে ভালোবেসে ফেলেছেন। এ সম্পর্কের কী পরিণতি তা নিয়ে মাথা ঘামানোর প্রয়োজন তাঁর নেই। আবেগ আর কোনদিন যুক্তি মেনে চলেছে? তা সে সত্য যুগ হোক আর কলি যুগ।
রাজনন্দিনী পার্বতী। তার বৈভবের অভাব নেই। তবু তিনি রাজপ্রাসাদের সব সুখ ও ঐশ্বর্য ছেড়ে গৌরিকুণ্ডে শিবকে পাবার জন্য তপস্যায় বসলেন। পার্বতীর এহেন তপস্যায় সপ্তঋষিরাও বিচলিত হয়ে পড়লেন। কিন্তু শিবকে টলানো গেল না। তিনি সতীর বিরহে কাতর হয়ে রইলেন। পার্বতীর কঠোর তপস্যাও শিবকে কাছে টানতে ব্যর্থ হল। ঋষিকুল শিবের কাছে গিয়ে জানালেন,পার্বতীর কঠোর তপস্যার কথা। শিব উদাস ভাবে সব শুনেও কোনও উচ্চবাচ্য করলেন না।
পার্বতীও তাঁর সংকল্পে অনড়। গৌরিকুণ্ডে তপস্যা চালিয়ে যেতে লাগলেন। একদিন এক অশীতিপর ব্রাহ্মণ এলেন পার্বতীর কাছে। বৃদ্ধ ব্রাহ্মণকে এগিয়ে আসতে দেখে পার্বতী তাঁকে ফুল ও ফল দিয়ে পুজো করলেন। ব্রাহ্মণ পার্বতীকে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কীসের জন্য তপস্যা করছো? কী চাও তুমি?”
পার্বতী উত্তরে সেই বৃদ্ধ ব্রাহ্মণকে জানালেন, তিনি শিবকে তাঁর স্বামী হিসেবে পেতে চান।
পার্বতীর উত্তর শুনে হাসতে লাগলেন সেই বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ। বললেন, “তুমি তো মহামুর্খ দেখছি। তুমি ত্রিযুগীনারায়ণরাজের কন্যা। তুমি কোথায় ইন্দ্রকে বা অন্য কোনও দেবতাকে বিয়ে করতে চাইবে,  তা না শিবকে বিয়ে করতে চাও? সোনার বদলে তামা নিয়ে বাস করতে চাও সারা জীবন? শিব সুপুরুষ নয়,সে নেশা ভাঙ করে। তার চালচুলোর ঠিক নেই। ট্যাঁকে টাকা নেই। গলায় বিষ ধারণ করে আছে। নিজের জীবন নষ্ট করো না মেয়ে। শিবকে ভুলে যাও।”

ব্রাহ্মণের উপদেশ শুনে প্রচণ্ড রেগে গেলেন পার্বতী। তিনি উত্তেজিত হয়ে বলে উঠলেন,“মুর্খ আপনি। শিব সম্পর্কে আপনি কিছুই জানেন না। আমার এখন খারাপ লাগছে এটা ভেবে যে, আপনার মতো শিব নিন্দুককে আমি ফুল-ফল দিয়ে পুজো করেছি। আপনি এক্ষুণি আমার চোখের সামনে থেকে চলে যান। নয়তো আমি আমার তপস্যার জায়গা বদলাতে বাধ্য হব।”

পার্বতীর রুদ্রমূর্তি দেখে সেই বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ তাঁকে আশ্বস্ত করে জানালেন তিনিই শিব। ব্রাহ্মণের ছদ্দবেশ ত্যাগ করে শিব তখন পার্বতীকে বললেন,“তোমার তপস্যায় আমি তুষ্ট। চলো তোমায় বাড়ি ছেড়ে দিয়ে আসি। মন্দাকিনীর তীর ধরে চলতে চলতে পার্বতীর সঙ্গে অনেক গল্প করলেন শিব। তিনি পার্বতীর মধ্যে সতীর ছায়া দেখতে পেলেন। 
খরস্রোতা মন্দাকিনীর দিকে তাকিয়ে পার্বতী শিবকে বলেই বসলেন,“আমায় বিয়ে করবেন?”
ত্রিযুগীনারায়ণরাজ হিমাবতের কাছে সপ্তঋষিরা এসেছিলেন বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে। হিমাবত আর না করেন নি। ঠিক হয় ত্রিযুগীনারায়ণের মন্দিরেই বিয়ের মণ্ডপ বসবে। মণ্ডপ সজ্জার দায়িত্ব দেওয়া হয় বিশ্বকর্মাকে। কিন্তু পাত্রের তো বাবা মা কেউ নেই। গোটা বিয়ের দায়িত্ব নিলেন বিষ্ণু। বিয়ের আসরে হাজির হলেন ব্রহ্মাও। আর বিয়ের পুরোহিত হলেন দেবগুরু বৃহস্পতি।
বিয়ের আচার অনুষ্ঠান শুরুর আগে শিব ও পার্বতীকে তিনটি কুণ্ডে স্নান করানো হয়। সেই তিনটি কুণ্ড যথাক্রমে ব্রহ্মকুণ্ড,বিষ্ণুকুণ্ড ও রুদ্রকুণ্ড নামে পরে খ্যাতি কুড়োয়।
                       রুদ্রকুণ্ড।

কিন্তু বিয়ে শুরু হতেই ক্লাইম্যাক্স শুরু হল। দেবগুরু বৃহস্পতি শিবকে জিজ্ঞেস করে বসলেন, তাঁর বাবা ও মায়ের নাম কী? তাঁর গোত্রই বা কী?
শিব পড়লেন আতান্তরে। তিনি তো স্বয়ম্ভু। কোথা থেকে বলবেন তাঁর বাবা মায়ের নাম! তিনিই তো আদি। তাঁর আবার গোত্র কী?
এদিকে দেবগুরু বৃহস্পতি বেঁকে বসেছেন। তাঁর সাফ কথা,পাত্রের বাবা মায়ের নাম ও গোত্র জানানো না হলে বিয়ে সম্পন্ন হবে না।
ব্রহ্মা ও বিষ্ণু একে অপরের মুখের দিকে তাকাচ্ছেন। বিবাহ বাসরে হটাৎ নীরবতা। সেই সময় মুশকিল আসান হয়ে এগিয়ে এলেন নারদ। তিনি বৃহস্পতিকে গিয়ে বোঝালেন যিনি সৃষ্টিকর্তা তাঁর আবার পিতা মাতা কি করে থাকবে? তাঁর গোত্রই বা কি করে হবে? তিনিই তো সমস্ত গোত্রের জনক।
বাঁধা বিপত্তি টপকে বিয়ের মন্ত্র পড়া শুরু হল। ত্রিযুগীনারায়ণ মন্দিরের ভেতর জ্বালানো হল বিয়ের যজ্ঞকুণ্ড। সেই অগ্নিকুণ্ডকে ঘিরে সাতপাকে বাধা পড়লেন শিব ও পার্বতী। তারপর তাঁরা সংসার পাতলেন কৈলাসে।

 ত্রিযুগীনারায়ণ মন্দির। এই মন্দিরেই বিয়ে হয়েছিল শিব-পার্বতীর।

অখণ্ড ধুনি। এই আগুনকে সাক্ষী রেখেই  সাতপাকে বাধা পড়েছিলেন শিব-পার্বতী

                                       ******
শিব পার্বতীর বিয়ের জন্য তৈরি যজ্ঞকুণ্ড ‘অখণ্ড ধুনি’ নামে আজও জ্বলছে। সত্য,ত্রেতা ও দ্বাপর এই তিনযুগ ধরে এই অগ্নিকুণ্ড নিজে থেকেই জ্বলে এসেছে। তাই এই মন্দিরের নাম ত্রিযুগী। আর যেহেতু এই মন্দিরে পূজিত হন বিষ্ণু তাই ত্রিযুগীনারায়ণ হিসেবেই এই মন্দিরের খ্যাতি। মন্দিরে শিব-পার্বতীর কোনও বিগ্রহ নেই। রয়েছে বিষ্ণু মানে নারায়ণের মূর্তি। তাঁর দু’পাশে লক্ষী ও সরস্বতীর বিগ্রহ। কলিযুগে পাপবৃদ্ধির কারণে ‘অখণ্ড ধুনির’ আগুন আর নিজে থেকে জ্বলে না। পূণ্যার্থীরা মন্দিরে প্রবেশ করেন ছোট ছোট কাঠের টুকরো নিয়ে। তাঁরা সেই কাঠের টুকরো নিক্ষেপ করেন অগ্নিকুণ্ডে। তার ছাইই প্রসাদ হিসেবে গণ্য হয়। আগুন নিভে এলে তা জ্বালিয়ে রাখার দায়িত্ব পালন করেন গ্রামের মানুষরা। ফলে শিব ও পার্বতীর বিয়ের সাতপাকের জন্য জ্বালানো যজ্ঞকুণ্ডের আগুন আজও জ্বালিয়ে রাখা হয়। এই জন্য এই মন্দিরকে ‘অখণ্ড ধুনি’ মন্দিরও বলে। উত্তরাখণ্ডের রুদ্রপ্রয়াগ জেলার একটি নির্ভেজাল গ্রাম ত্রিযুগীনারায়ণ। আর সেখানেই এই মন্দির। কেদারনাথ যাওয়ার পথে শোনপ্রয়াগ বলে একটা জায়গা পড়ে। তার পাঁচ কিলোমিটার আগে সীতাপুর বলে একটা ছোট্ট চটি আছে। সেখান থেকে তেরো কিলোমিটার গেলে ত্রিযুগীনারায়ণ গ্রাম। গাড়োয়লের মানুষের বিশ্বাস এই মন্দিরেই বিয়ে হয়েছিল শিব ও পার্বতীর। এখানকার মানুষের মুখে মুখে ঘোরে শিব-পাবর্তীর এই অমর প্রেম কাহিনি। পুরাণে শিব-পার্বতীর বিয়ে নিয়ে পরস্পরবিরোধী নানা কাহিনির উল্লেখ আছে। তবে আমার এই কাহিনি স্হানীয় জনশ্রুতির ওপর ভিত্তি করেই লেখা।

Comments

Post a Comment

Popular posts from this blog