।। নির্জন এক হ্রদের খোঁজে।।
“অ্যাডভেঞ্চার
ইজ আউট দেয়ার।” গেস্ট হাউজ থেকে বের হয়ে বাইরে আসতেই ধানকার মনাস্ট্রির চত্বরে
দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলেছিলেন এক বৌদ্ধ লামা। ওনার কাছ থেকে জেনে নিচ্ছিলাম ধানকার লেক যাওয়ার হদিশ। ধানকার
মনাস্ট্রির ঠিক উল্টো দিকেই যে ন্যাড়া পাহাড়টা উঠে গিয়েছে তার ওপর দিয়েই পায়ে চলা
পথ একটা দেখা যাচ্ছিল বটে। কিন্তু ওই খাড়া রুক্ষ পথ পেরিয়ে সেই হ্রদের কাছে
পৌঁছোতে পারব কিনা বুঝতে পারছিলাম না।
বৌদ্ধ লামা
বোধহয় আমার মনের কথা পড়ে ফেলেছিলেন। উৎসাহ দেওয়ার ভঙ্গিতে বলে উঠেছিলেন,“চলে যান।
অসুবিধা হবে না। তবে ধীরে চড়াই ভাঙবেন। সামনের পাহাড়টা টপকে বাঁ দিকে সোজা হাঁটতে
থাকবেন।
গতকাল ধানকার এসে পৌঁছানোর পর মনাস্ট্রির
গেস্ট-হাউজে থেকে গিয়েছিলাম। ইচ্ছে ছিল এ যাত্রায় ধানকার লেকটা ট্রেক করে যাব।
একটা সময় নোনোজ রাজারা রাজত্ব করতেন এই রুক্ষ প্রান্তরে। তারাই বানিয়েছিলেন ধানকার
দুর্গ। সে গল্প আগেই শুনিয়েছি। নোনোজ রাজাদের রাজত্বের সময় ধানকারের বাসিন্দাদের
জলের এক মাত্র সোর্স ছিল ওই হ্রদ। সেই হ্রদ মানুষের তৈরি নয়। প্রাকৃতিক নিয়মেই
তৈরি হয়েছিল ওই স্বচ্ছ নীল জলের হ্রদ। তাই ওই হ্রদ এখানকার মানুষদের কাছে আজও
পবিত্র। এতোটা এসে সেই হ্রদ না দেখে ফিরে যাওয়ার মতো মুর্খামি করতে পারব না। তাই
সেই লামার পরামর্শ মেনে ভগবান বুদ্ধের নাম নিয়ে এক অজানা পথে পা বাড়ালাম।
ওই পাহাড় টপকাতে হবে।
রাস্তা বলে কিছু নেই। পায়ে চলা সরু পাথুরে পথ।
এই পথ আমার কাছে
সম্পূর্ণ অজানা এবং অচেনা। সাথে কোন গাইড টাইডও নেই। ন্যাড়া পাহাড়ের গা বেয়ে সাপের
মতো এঁকে বেঁকে ওপরের দিকে উঠে গিয়েছে ধুলো মাটি মাথা রুক্ষ পাথুরে পথ। আগে থেকে
কিছু প্ল্যান করা ছিল না। হঠাৎই মনে হয়েছিল ধানকার যখন এলাম তখন রুক্ষ পাহাড়ের
মাথায় সেই পবিত্র হ্রদকে দেখেই ফিরব। খানিকটা ঝুঁকি নেওয়া হয়ে গেল হয়ত। কিন্তু ওই যে, কথায় আছে না জীবনে ঝুঁকি না নিলে
কিছু পাওয়া যায় না। নো রিস্ক, নো গেইন।
ট্রেক করে
অনেকটা উঠে আসার পর পিছন ফিরে দেখছিলাম ধানকার গ্রামটাকে। ক্রমশ ছোট হয়ে আসছিল
ধানকার গুম্ফা। ডানদিকে অনেক নীচে স্পিতি নদী। আরও দূরে স্পিতি ও পিন নদীর
সঙ্গমস্থল। পারফেক্ট ল্যান্ড স্কেপ। নদীখাত। জলের রেখা। অববাহিকা জুড়ে উপত্যকা,
যেন শিল্পীর আঁকা ছবি।
ওপর থেকে দেখা ল্যান্ডস্কেপ।
ধানকার লেকের পথে অনেকটা উঠে
যাওয়ার পর নীচে বয়ে যাওয়া স্পিতি নদী ও তার অববাহিকা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা উপত্যকাকে
এরকমই লাগে। এখান থেকে পিন ভ্যালির অনেকটা দেখা যায়। পাথরের ওপর বসে ওই দূরের দিকে
তাকিয়ে মনে হয়,একখণ্ড জমি নিয়ে মানুষের কত লড়াই। গুরুত্ত্ব পেতে কত শব্দ খরচ।
হাজার হাজার ছবির ভিড়। সে ছবিতে নদী নেই,সমুদ্র নেই,পাহাড় নেই,সবুজ নেই,ভেসে যাওয়া মেঘ নেই। শুধু "আমিত্ব" আছে। এখানে, এই নির্জন রুক্ষ প্রান্তরে কে কাকে দেখে? কে কার স্ট্যাটাস নিয়ে বিচলিত? আদতে কিছু নেই,সব শূন্য। তোমার
আমার লড়াই সব ভেসে যায়। যদি রাখতে পারো দাগ রেখে যাও। আর কিছু থাকে না। সব ভেসে
যায়... নুড়ি,পাথর,ধুলোবালি,জীবন তো একমুটো ছাই বই কিছু নয়।
স্পিতি নদীল গতিপথ।
ধানকার
মনাস্ট্রির গেস্ট হাউজের সামনে দাঁড়িয়ে সেই বৌদ্ধ লামাকে যখন জিজ্ঞেস করেছিলাম,
লেক’টা কতদূর। উনি বলেছিলেন, “দু-আড়াই কিলোমিটার আপ হিল ট্রেক। উচ্চতা তেরো হাজার
পাঁচশ সত্তর ফুট।”
“আর রাস্তা?”
প্রশ্নের উত্তরে আমাকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, “আরাম সে যাইয়ে পৌছ যাওগে।” কথা শেষ
করে উনি বাঁ দিকে কোণাকুনি একখণ্ড ভাসমান মেঘ দেখিয়ে বলেছিলেন, “লেক ইজ দেয়ার
জাস্ট আন্ডার দ্য ক্লাউড।” আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে হয়েছিল, ওই তো মেঘটা ভাসছে।
ওটার ঠিক নিচে স্বচ্ছ জলের সেই পবিত্র লেক। পৌঁছে যাব। মোটামুটি একটা আন্দাজ করে
দেখলাম প্রথমে সামনে খাড়া ন্যাড়া রিজটা টপকাতে হবে। তারপর বাঁ দিকে যেতে হবে। আকাশে
ভাসমান স্থির ওই মেঘের অবস্থান অন্তত তাই বলছে। ব্যস, ধানকার লেক অভিযানে বেরিয়ে
পড়েছিলাম। তবে দেখলাম টুকটাক কয়েকজন পাহাড় চড়ছেন লেক দেখতে যাওয়ার আশায়।
আধঘন্টা মতো
ঠিকঠাক চলার পথ পেলাম। তারপর পথ হারানোর একটা ব্যাপক চান্স রয়েছে। দেখলাম কয়েকজন
বাঙালি পর্যটক পথ হারিয়ে কয়েক ঘন্টা ঘুরপাক খেয়ে লেকের হদিশ না পেয়ে ফিরে আসছেন।
তাই তাড়াহুড়ো না করে সাবধানে পথ চলাটাই শ্রেয় বলে মনে করলাম। প্রবল শৈত্য প্রবাহ চলছিল।
হাঁটার সময় গরম লাগলেও একটু দাঁড়ালেই হিমেল হাওয়ায় কাবু হতে হচ্ছিল। পদে পদে পা
হড়কানোর সমূহ সম্ভাবনা। কারণ এ পথে হার্ড রক নেই,পুরোটা ঝুরো পাথরের পথ। পা ভীষণ
স্লিপ কাটে।
রুক্ষ পথ।
If
you don't know where you are going,any road will get you there... এক এক সময় মনে হচ্ছিল কোথায় যাচ্ছি আদৌ জানি না। তাহলে কি যে
কোন পথে হেঁটেই পৌঁছে যাব কাঙ্খিত সেই হ্রদের ধারে? সেই বৌদ্ধ লামার কথার ওপর ভরসা করে অজানা পথে পা বাড়িয়েছি। এখন আর ফেরার
উপায় নেই। আসলে অনেক্ষণ এই
রুক্ষ পথে চলার পর পথ হারানোর আশঙ্কা করছিলাম। কারণ কোনও দিকচিহ্ন খুঁজে পাচ্ছিলাম
না। আর চারদিকে শুধু রুক্ষ পাহাড়। তার বুকে খেলে বেড়াচ্ছে মেঘেদের ছায়া। পাহাড় ও রুক্ষ প্রান্তরের রং দেখে মনে হচ্ছিল বোধ হয় মঙ্গলের মাটিতে
ট্রেক করছি। মাথার ওপর দিয়ে হুসহুস করে উড়ে যাচ্ছে সফেত মেঘের দল। কাঁটা ঝোপগুলো
তিরতির করে কাঁপছে হিমেল হাওয়ায়। চোখে মুখে সেই ছুরির ফলার মতো হাওয়া এসে লাগলে
মনে হচ্ছিল ধুর বাবা এর থেকে মিলেনিয়াম পার্কে বসে গঙ্গার হাওয়া খাওয়া ভালো। এতো
কষ্টের প্রয়োজন তো ছিল না!
কোন দিকে যাব,বোঝা দায়।
আস্তে আস্তে পথ কঠিন হল। পরপর কয়েকটা রিজ
পার হলাম। তারপর সেই ভাসমান মেঘের অবস্থান আন্দাজ করে এগোতে থাকলাম। তবে সেই মেঘ
আর দেখতে পেলাম না। কোন ফাঁকে উড়ে গেছে কে জানে? পথে কোনোও মানুষজন নেই। ফলে ঠিক
যাচ্ছি না ভুল, তাও ঠাওর করা মুশকিল। তবে মাঝেমাঝে দেখছিলাম পাথরের গায়ে লেক
শব্দটা লেখা। দিকচিহ্ন দেখে বুঝতে পারছিলাম ঠিক পথেই যাচ্ছি।
চড়াই ভাঙতে ভাঙতে মনে হচ্ছিল পৃথিবীর ছাদে
পৌঁছে যাব। চারদিকে শুধু রুক্ষ ধূসর প্রকৃতি। পাথরে বুকে কাঁটা ঝোপ জাতীয়
গাছ। তবে কোথাও কোথাও রঙের ছোঁয়া দিয়ে
রেখেছেন ঈশ্বর। পাথরেও ফুল ফোটানোর মতো তিনি কাঁটা ঝোপের আড়ালে ফুটিয়ে রেখেছেন রঙিন
ফুল।
চারদিকে কেউ কোথাও নেই। যাকে বলে, ‘নো ম্যানস
ল্যান্ড’। মাইলের পর মাইল জুড়ে ঢেউ খেলানো রুক্ষ প্রান্তর। দূরে গিয়ে মিশেছে গভীর
নীল আকাশের বুকে। আকাশে দল পাকাচ্ছে মেঘের দল। তার ছায়া ভেসে বেড়াচ্ছে রুক্ষ
প্রান্তর জুড়ে। সৌন্দর্য খুঁজে বের করতে হয়। এই রুক্ষতার বুকেও প্রকৃতি এখানে অনেক
উদার। শুধু দেখার মতো চোখ থাকতে হয়।
রুক্ষ প্রকৃতির বুকেও কোথাও কোথাও রং-এর খেলা।
একটা সময় দূর থেকে দেখতে পেলাম লেকের
আকৃতি। বুঝলাম পৌঁছে গিয়েছি অভিষ্ট লক্ষ্যে। হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। ধীরে ধীরে গিয়ে
দাঁড়ালাম লেকের জলের কাছে। একেবারে টার্কিশ ব্লু রঙের জল। আবার কখনও পান্না সবুজ।
দিক বদলালেই বদলে যাচ্ছে জলের রং। এক এক দিক থেকে দেখলে হ্রদের জলের রং এক এক রকম
দেখায়। লেকের বাঁদিকে একটা স্তুপ। তাতে পতপত করে উড়ছে প্রেয়ার ফ্ল্যাগ। একেবারে
যাকে বলে ডিভাইন প্লেস। চির শান্তির জায়গা। ভালো লাগছিল এটা ভেবে যে বহু মানুষ তো
এখানে পৌঁছানোর কথা ভাবেতেই পারে না। যে অল্প সংখ্যক মানুষ এখানে আসেন আমিও তাঁদের
মধ্যে একজন। এও এক ধরণের বিরল অভিজ্ঞতা।
ধানকার লেকের বুকে রোদ ও ছায়ার খেলা।
ধানকার লেক।
ধানকার থেকে ধানকার লেক পৌঁছোতে আস্তে
হাঁটলে ঘন্টা তিনেক সময় লাগবে। ফলে যাঁরা ধানকার মনাস্ট্রির গেস্ট হাউজে একটা দিন
থাকবেন তাঁরা পরদিন সকালে লেকের উদ্দেশ্যে রওনা দিতে পারেন। তাহলে গোটা দিনটা পাবেন। তাড়াহুড়ো করতে হবে না।
আর যাঁরা ধানকারে না থেকে দিনে দিনে লেক ঘুরে আসতে চান তাঁরা টাবো বা কাজা থেকে
চেষ্টা করবেন একটু তাড়াতাড়ি ধানকারে পৌঁছাতে। তাহলে ট্রেক করে লেক দেখে ফিরে
যাওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সময় পাবেন। অতিরিক্ত অ্যাডভেঞ্চার প্রিয়রা লেকের ধারে
ক্যাম্প করে রাত কাটাতে পারেন। অনেক বিদেশি পর্যটক লেকের ধারে তাঁবু খাটিয়ে রাতে
থেকে যান। তাতে লেকের সৌন্দর্য আরও ভালো ভাবে উপভোগ করা যায়। তবে এখানে প্রবল
ঠান্ডা সেটা মাথায় রাখবেন। আর রেশন ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সঙ্গে রাখতে ভুলবেন না।
এখানে কিছুই পাওয়া যায় না।
হ্রদের জলে যেন মেঘ নেমে আসে।
ধানকার মনাস্ট্রি পর্যন্ত বেশ কিছু পর্যটক
এলেও এই রুক্ষ বিপজ্জনক পথে খুব বেশি মানুষ ট্রেক করে ধানকার লেক দেখার সাহস করেন
না। তবে কিছু মানুষ চিরকালই ব্যতিক্রম। তাঁরা ট্রেক করে পাড়ি দেন এই পথে। খুব কম
মানুষ আসেন বলে প্রচারের আলো থেকেও বঞ্চিত এই সুন্দর মনকাড়া স্বচ্ছ জলের হ্রদ।
ভাবতেও অবাক লাগে এই পাণ্ডববর্জিত জায়গায় যেখানে কোন প্রাণের স্পন্দন নেই, জনবসতি
নেই, চারদিকে শুধুই রুক্ষতা তার মাঝেও ঈশ্বর আপন খেয়ালে সাজিয়ে রেখেছেন এই হ্রদকে।
এই হ্রদের আকৃতি অনেকটা মাছের মতো। আবার এই বরফ শীতল জলে মাছেরাও আছে। সে অর্থে
প্রাণের স্পন্দন খুঁজে পেলাম এখানেও। বৃষ্টিচ্ছায়া অঞ্চল তাও এই দুর্গম পাহাড়ের
মাথায় এমন সুন্দর হ্রদ। প্রকৃতির রহস্য কে কবে ভেদ করতে পেরেছে? এই ভাবতে ভাবতেই
দুপুরের পর ফিরে এসেছিলাম ধানকার গ্রামে। মনাস্ট্রির গেস্ট হাউজে ফিরে খোঁজ করেছিলাম
সেই বৌদ্ধ লামার। কিন্তু তার হদিশ আর পাইনি। অনেক লামার ভিড়ে তিনি তখন কোথায় মিশে
গিয়েছিলেন জানি না।
সঙ্গে আরও কিছু ছবি।
ধানকার হ্রদের জলে আকাশের রং ধরা পড়ে।
ধানকার লেক ,দূর থেকে।
রং বদল।
হ্রদের পাশে বৌদ্ধ স্তুপ। হিমেল হাওয়ায় পতপত করে
ওড়ে প্রেয়ার ফ্ল্যাগ।


Ami chirokal e pahar er khub vokto tai apner sob lekha r chobi mon diye dakhi, khub valo lage. Apner chobi dakhe nijek sei jaigai feel korar chesta kori.
ReplyDeleteভালো লাগল। তবে আমি শুধু পাহাড়ের গল্প বলি না। ওই জায়গার মানুষ তাঁদের সংস্কৃতি ও ইতিহাসকে তুলে ধরি।
Deleteধন্যবাদ আপনাকে, এমন সুন্দর একটা জায়গার ছবি এবং গল্প লেখার জন্য। আপনার গল্প পড়ে নিজেকে সেই জায়গায় অনুভব করি, মনে হয় কিছুটা হলেও নিজের যাওয়ার ইচ্ছেটা পুরন হলো, সত্যি অসাধারন। অনেক শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা রইলো, এগিয়ে যান।
DeleteVdo taa agei dekhechilam......lekha taa pore mon bhalo hoye gyalo.....thnk u chinuda
ReplyDelete