।। হিমালয়ের অজন্তা।।

একেবারে হাড় কাঁপানো সকাল। ইংরেজিতে যাকে বলে চিলি  মর্নিং। ঘর থেকে বাইরে আসতেই এক ঝলকে মনে হল চোখের সামনে বুঝি সোনার পাহাড়। না,তা নয়।আসলে ন্যাড়া পাহাড়ের গায়ে সোনালি রোদ মেখে আছে। তাই গোটা পাহাড়টাই সোনার পাহাড় হয়ে গিয়েছে। ন্যাড়া পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসছে সোনালি রোদ। আর তাকেই দেখেই হঠাৎ এক ঝলকে সোনার পাহাড় ভেবে ভুল করে বসেছিলাম আর কী!

ঘর থেকে বের হলেই এ দৃশ্য। 
ন্যাড়া পাহাড় রোদ মেখে থাকে।
টাবোর সোনালি সকাল।

যে বাড়িটিতে থাকার জায়গা জুটিয়েছি সেটি এক্কেবারে আপেল বাগানের মধ্যে। ঘর থেকে বের হলেই চারদিকে গাছ ভর্তি আপেল। কিন্নরের আপেল তো আগেই খেয়েছি এবার স্পিতি উপত্যকার আপেলের স্বাদ নিলাম মন ভরে। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পরই মকান মালকিন এক কাপ চায়ের সাথে খানকতক আপেল দিয়ে গেছেন ঘরে। গাছ পাকা আপেল দিয়েই ব্রেক ফাস্ট সেরে নিয়েছি। মকান মালকিনের দাক্ষিণ্যে আমার সকালের ব্রেকফাস্টের খরচা বেঁচে গেল।
আমার আস্তানা। ঘর থেকে বের হলেই গাছ ভর্তি আপেল।
রুক্ষ প্রান্তরে যতদূর চোখ যায় আপেল বাগিচা।
দেখলেই পেড়ে ফেলতে ইচ্ছে করে।

একটু খরচ বাঁচায় মনটাও বেশ ফুরেফুরে। ঘরের বাইরে পা রাখলেই আপেল বাগিচা। সুতরাং গোটা সকালটাই আপেল বাগিচায় ঘুরে ফিরে কাটিয়ে দিলাম। মনে মনে ঈশ্বরকে বললাম, পরজন্মে আপেল বাগানের মালি করে পাঠিও। টাবোর বাসিন্দদের অনেকেরই আপেল বাগান আছে। তা থেকে বিকল্প আয়ও করেন তাঁরা। আপেল বাগানে আর ঘোরাঘুরি করে লাভ নেই তার চেয়ে  চলুন বেরিয়ে পড়ি রাস্তায়। একটু ভালো করে ঘুরে দেখি এই ছোট্ট শহরটাকে। নামেই শহর, টাবো আসলে রুক্ষ পাহাড়ি গ্রাম। এখানে সাকুল্যে সত্তরটি বাড়ি রয়েছে। জনসংখ্যা ছ’শোর আশেপাশে ।
টাবো শহরের প্রবেশ পথ।
এমনই রুক্ষ শহর টাবো।

হিমাচলের লাহুল-স্পিতি জেলার একটি ছোট্ট আধা শহর টাবো। সে অর্থে রেকংপিও আর কাজার মাঝে এই টাবোই একমাত্র শহর। স্পিতি নদীর তীরে অবস্থিত এই শহরের উচ্চতা দশ হাজার সাতশো ষাট ফুট। বছরের সাত মাস প্রায় বরফের শাসন থাকে এই টাবোতে। চারদিকে রুক্ষ পাহাড় ঘেরা এই আধা শহরে পর্যটকদের জন্য থাকার গুটিকতক ব্যবস্থা আছে। রয়েছে ব্যাঙ্ক স্কুল এবং হাসপাতাল। আছে সরকারি অতিথি নিবাসও। আয়তনে খুব ছোট এই শহরটাকে পায়ে হেঁটেই ঘুরে নেওয়া যায়। একট ছোট্ট বাস বা জিপ স্ট্যান্ড। তার চারপাশেই গড়ে উঠেছে হোটেল ও হোম-স্টে গুলো । তবে শীতের মরশুমে এখানে কেউ আসে না। পথ বরফে বন্ধ থাকে। তাপমাত্রা নেমে যায় মাইসাসে। নাকো থেকে সুমদো হয়ে পৌঁছাতে হয় টাবো। নাকো থেকে টাবোর দূরত্ব  ৬৫ কিমি। আর সুমদো থেকে ৩৪ কিলোমিটার। এই সুমদোতেই কিন্নর জেলার শেষ, শুরু হয় লাহুল-স্পিতি জেলা। রেকংপিও থেকে হিমাচল প্রদেশ পরিবহণ নিগমের বাস কাজা যায়। সেই বাস টাবো হয়েই যায়। তবে এ পথে বাসের ভরসায় না থেকে সঙ্গে গাড়ি রাখাই ভাল।
স্পিতি নদী।
সুমদো। এখান থেকেই শুরু লাহুল-স্পিতির।
টাবোর ছোট্টো বাস বা জিপ স্ট্যান্ড।
এরকমই রঙিন থাকার আস্তানা।
সরকারি অতিথি নিবাস।
লোকগাথা অনুযায়ী, তিব্বতের রাজা নেপালের রাজকুমারীকে বিয়ে করে এখানে আসেন বৌদ্ধ ধর্ম প্রসারে। তাপর এখানেই থেকে যান। তারপর থেকি এই বিস্তীর্ণ এলাকায় বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে।
ইতিহাস বলছে, একসময় এই অঞ্চলটি পশ্চিম তিব্বতি রাজবংশ পুরুং গুগে- অধীনে ছিল তারও আগে এখানে ঝাং ঝুংরা রাজত্ব করত  পুরং গুগ বংশের শ্রেষ্ঠ রাজা -শে- (E-SHES-O’D) ছিলেন একজন নিষ্ঠাবান বৌদ্ধ লামা৷  তিনি তাঁর রাজত্ব প্রসারিত করেছিলেন লাদাখ থেকে তিব্বত হয়ে পুরাং পর্যন্ত। তিনি তাঁর দুই পুত্র মিলে ৯৯৬ খ্রিস্টাব্দে মহাযান বৌদ্ধ শাখার অন্তর্গত বজ্রযান সংঘের মত-অবলম্বনে টাবোর এই ধর্মচর্চা কেন্দ্রটি স্থাপন করেন৷ মন্দিরের স্থাপত্যে গ্রিক বৌদ্ধ কলার মিলন চোখে পড়ে৷ নান্দনিক সুষমায় মণ্ডিত এর শিল্পকলা গবেষকদের কাছে এক ঐতিহাসিক দলিল। সংস্কৃত, পালি তিব্বতি ভাষায় রচিত বহু প্রাচীন পুঁথি পাণ্ডুলিপি ঠের সংগ্রহশালায় রক্ষিত আছে এ- শে- ও’দ-এর উদ্যোগেই কাশ্মীর থেকে বাছাই করা শিল্পীদের নিয়ে আসা হয় এখানে। তাঁদের হাতেই সঁপা হয় গুহা চিত্রের দায়িত্ব। গুম্ফার ভেতরে ছবি তোলা বারণ। বিশেষ অনুমতি নিয়ে টাবো মনাস্ট্রির সৌজন্যে ভেতরের ছবিগুলি এই ব্লগে ব্যবহার করা হল।

মূল ফটক থেকে টাবো গুম্ফা
হাজার বছরেরও বেশি প্রাচীন টাবো গুম্ফা। পুরোটাই মাটির তৈরি।
 গুম্ফায় প্রবেশের পথ।
টাবো গুম্ফা।

টাবোকে বলা হয় হিমালয়ের অজন্তা। আর তা এই টাবো মনস্ট্রির জন্যই বলা হয়ে থাকে। হাজার বছরেরও বেশি প্রাচীন এই মনাস্ট্রি। নশো ছিয়ানব্বই খ্রীষ্টাব্দে তৈরি হয়েছিল এই গুম্ফা। প্রাচীনত্ব ও বৌদ্ধ ধর্ম চর্চার দিক থেকে তিব্বতের থোলিং মনাস্ট্রির পরেই এই গুম্ফাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। টাবোর মূল আর্কষণও এই গুম্ফা। এই গুম্ফার পোশাকি নাম অবশ্য চোস খোর (CHOS KHOR)।  মাটির তৈরি এই গুম্ফার সামনে দাঁড়ালে মনে হয় যেন ফিরে গেছি হাজার বছর পিছনে। তিব্বতীয় শৈলিতে তৈরি ফ্রেস্কো চিত্র,স্টাকো শৈলির তৈরি বুদ্ধ মূর্তির সংগ্রহশালা দেখলে তাক লেগে যায়। হাজার বছর আগে ভেসজ রং দিয়ে কাশ্মীরের শিল্পীরা জাতকের কাহিনি এঁকেছিলেন মাটির দেওয়ালে। সেইসব দূর্দান্ত দেওয়ালচিত্র আজও সযত্নে ধরে রাখা আছে। সেই কারণেই এই গুম্ফাকে বলা হয় হিমালয়ের অজন্তা। ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের সম্মানও পেযেছে টাবো গুম্ফা। ছয় হাজার তিনশ বর্গমিটার অঞ্চলে  ন’টি গুম্ফা, তেশটি চোর্তেন,তিরিশটি থাঙ্কা ও প্রচুর দেবদেবীর মূর্তি রাখা রয়েছে। পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে রয়েছে প্রাচীন গুহাগুলিও। ন্যাড়া পাহাড়ের ঢালে লেখা বৌদ্ধ মন্ত্র “ওম মণি পদ্মে হুম।”  ভারতবর্ষের সব থেকে প্রাচীন মসাস্ট্রি হল এই টাবো মনাস্ট্রি। দলাই লামা এই টাবো বৌদ্ধ মঠেই অবসরের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। তিনি মনে করেন এই বৌদ্ধ মঠটি অন্যতম পবিত্র বৌদ্ধ মঠ।
টাবো গুম্ফার অন্দর মহল।
টাবো গুম্ফার অন্দর মহল।
 টাবো গুম্ফার ভেতরের গুহাচিত্র। ভেসজ রং ব্যবহার করে যেগুলি আঁকা হয়েছিল হাজার বছরেরেও বেশি আগে।
 টাবো গুম্ফার ভেতরের গুহাচিত্র। ভেসজ রং ব্যবহার করে যেগুলি আঁকা হয়েছিল হাজার বছরেরেও বেশি আগে।
  টাবো গুম্ফার ভেতরের গুহাচিত্র। ভেসজ রং ব্যবহার করে যেগুলি আঁকা হয়েছিল হাজার বছরেরেও বেশি আগে।
 টাবো গুম্ফার ভেতরের গুহাচিত্র। ভেসজ রং ব্যবহার করে যেগুলি আঁকা হয়েছিল হাজার বছরেরেও বেশি আগে।

 টাবো গুম্ফার ভেতরের গুহাচিত্র। ভেসজ রং ব্যবহার করে যেগুলি আঁকা হয়েছিল হাজার বছরেরেও বেশি আগে।

প্রাচীন এই গুম্ফাটির পাশাপাশি নতুন একটি গুম্ফাও তৈরি করা হয়েছে। এখানে বৌদ্ধ লামাদের বাসস্থান। পর্যটকদের থাকার জন্য গেস্ট হাউজও রয়েছে এই নতুন মনাস্ট্রিতে।
 টাবোর নতুন মনাস্ট্রি
 টাবোর নতুন মনাস্ট্রি




চারদিকে পাহাড় ঘেরা টাবো অনেকটা গামলার মতো। টাবোর পাশ দিয়ে বয়ে গিয়েছে স্পিতি নদী। নদীর তট জুড়েই টাবোর বিস্তার। বেশ কিছুটা সমতল মতো জায়গা। ফলে প্রকৃতি রুক্ষ হলেও মানুষ এখানে চাষবাস করেন।  আর আপেল বাগানের কথা তো আগেই বলেছি। ভালো পরিমাণ তুষারপাতের কারণে এখানে আপেলের ফলন বেশ ভালো। আর এখানকার আপেল খেতে বেশ সুঃস্বাদু। আর তার তেমনই রং। এখানেও গোল্ডেন আপেল ভালো পরিমানে হয়। আপেল বাগানে ঘুরে ফিরে না হয় গোটা দিনটা কাটিয়ে দিন। তারপর ফের রওনা দেওয়া যাবে অন্য কোনও জায়গার উদ্দেশ্যে।

 আপেল বাগিচা
 গোল্ডেন আপেল
 গোল্ডেন আপেল

 গোল্ডেন আপেল
 গোল্ডেন আপেল

আপেলের ভারে নুইয়ে পড়েছে গাছ।
টাবো।  
টাবো মনাস্ট্রি। 
টাবো। 
আপেল বাগানে রৌদ্র-ছায়ার খেলা।
টাবো। 
টাবোর স্টেট ব্যাঙ্ক শাখা। 
রুক্ষ টাবোতেও ফোটে ফুল। 
রঙিন প্রেয়ার ফ্ল্যাগ

Comments

Post a Comment

Popular posts from this blog