ধুসর শৈশব।


বাউণ্ডুলেপণা সেই পুরাতন ভৃত্যের মতো। ছাড়ালেও আমায় ছেড়ে যায় না। সুখে থাকতে আমাকে ভূতে কিলোয়। যেখানে যাওয়ার কথা নয় সেখানে চলে যাই। ইচ্ছে দমিয়ে বাঁচা যে আমার কম্ম নয়, তা এই আধবুড়ো বয়সে এসে আরও বেশি করে টের পাচ্ছি। তা এহেন এক অদম্য ইচ্ছে ভর করেছিল আমার মগজে। কাজায় এক সকালে আলুর পরোটা খেতে খেতে হঠাৎ ইচ্ছে হল গ্রেটার  হিমালয়ান রিজিয়নে বাইক রাইড করব। ব্যস, বাইক ভাড়া করে বেরিয়ে পড়লাম রুক্ষ প্রান্তরে। বাইক রাইডের গল্প এটা নয়। সে গল্প অন্য কোনোদিন শোনাব। আজ এক অন্য জীবনের গল্প। যে জীবনের গল্পে কোনও  রং নেই। শুধুই ধুসর চাদর বিছানো। এ এক অন্য ভারতবর্ষ। আমাদেরই দেশের ভেতর ঘুমিয়ে থাকা আরেকটি দেশ। যে দেশের মানুষের কথা কেউ বলে না। যে দেশের ছবি খুব একটা প্রকাশ্যে আসে না।

হিমাচলের প্রত্যন্ত প্রান্তরে তিব্বত ঘেঁষা গ্রাম ‘হিক্কিম’এই গ্রামেই রয়েছে বিশ্বের সব থেকে উঁচুতে অবস্থিত পোস্ট অফিসটি। এবং সেটি এখনও যথেষ্ট সচল। এই পোস্ট অফিস বা ডাকঘরটি দেখতে কিছু মানুষ আসেন। আসলে কিছু মানুষ তো চিরকালই অন্য চোখে দুনিয়াটা দেখতে ভালোবাসেন। ফলে তাঁরাই আসেন এই চোদ্দ হাজার পাঁচশ সাতষট্টি ফুট উঁচুতে অবস্থিত হিমালয়ের কোলে রুক্ষ গ্রাম হিক্কিমেতার জন্য রাস্তায় কেজি কেজি ধুলো খেতে হয়। বৃষ্টিচ্ছায়া অঞ্চল, ফলে এইসব এলাকায় বৃষ্টির দেখা মেলে না। বছরে ছ-সাত মাস বরফের নীচেই চাপা পড়ে থাকে গোটা এলাকা। রুক্ষ প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করেই বেঁচে থাকতে হয় এখানকার বাসিন্দাদের।
                                ছবি:  হিক্কিম গ্রামেই বিশ্বের সবথেকে উঁচুতে অবস্থিত পোস্ট অফিস।

সেই হিক্কিম গ্রামে বাইক নিয়ে এসে দাঁড়াতেই দেখলাম হুড়মুড় করে একদল কচিকাঁচা আমাদের দিকে দৌড়ে আসছে। রাস্তায় বন্ধু হয়ে যাওয়া এক জার্মান দম্পতিও বাইক রাইড করে এসেছেন আমার সঙ্গে। তাঁরা থাকেন জার্মানির কোলন শহরে। ওনাদের সঙ্গে আলাপ হয়ে একদিকে ভালোই হয়েছে। কারণ,এই রুক্ষ প্রান্তরে টানা বাইক চালাতে বোর-ই লাগে। একে তো উচ্চতাজনিত সমস্যা। তার ওপর চারপাশের দৃশ্য পাল্টায় না। অনেকক্ষণ বাইক চালানোর পর মনে হবে যেন একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি। সেই সাপের মতো রাস্তা একে বেঁকে উঠে গিয়েছে। একপাশে হলদেটে ন্যাড়া খাড়া পাহাড়। অন্যপাশে অতল খাদ। ন্যাড়া পাহাড়ের গায়ে কাঁটা ঝোপ। আর গত রাতে পড়া ছোপ ছোপ সাদা বরফ। দেখলে মনে হবে কেউ যেন পাহাড়ের গায়ে বরফের ঘুঁটে দিয়ে রেখেছে। তবে ঘুঁটের রং সাদা। দু’পাশের দৃশ্যপট না পাল্টালে বাইক রাইডিং খুব বোরিং। পিছনে সওয়ারি থাকলেও হেলমেট আর শনশন হাওয়ার দৌলতে কেউ কারুর কোনো কথা শুনতে পাওয়ার জো নেই। ফলে প্রায় পনেরো হাজার ফুট উঁচুতে বাইক চালাতে চালাতে, “এই পথ যদি না শেষ হয়”... গানটি গাইলেও রোমান্টিসিজম জেগে উঠবে না। 

মূল সড়ক থেকে ধুলো মাখা মাটির রাস্তা নেমে গিয়েছে নীচের দিকে। রাস্তা বলতে পায়ে চলা পাথুরে পথসেই রাস্তা দিয়ে ওপরের দিকে প্রাণপণে ছুটে আসছে বাচ্চগুলো। কয়েকজন আবার পিঠে একটাকে বেঁধে নিয়েছে। পিঠেরজন এখনও হাঁটতে শেখেনি। আমার দুই জার্মান সঙ্গী অবাক হয়ে সেই দৃশ্য দেখে একটু ঘাবড়ে গেছেনতাঁদের আশ্বস্ত করে বললাম,“ভয়ের কিছু নেই।”
আমি জানি, ওরা ছোট ছোট পায়ে কেন দৌড়চ্ছে। এই দৃশ্য আমি এর আগেও দেখেছি।
                                ছবি: একা নয়, পিঠে নিয়ে দৌড়।

মূল সড়ক থেকে গোটা হিক্কিম গ্রামটা দেখা যায়। রুক্ষ, ধুসর। সবুজের চিহ্ন মাত্র নেই। কিন্তু প্রাণের চিহ্ন আছে। বাড়িঘর, মানুষজন, সংসার। রুক্ষ পাথুরে ন্যাড়া পাহাড়ের কোলেই গড়ে উঠেছে বসতি। অল্প কয়েকটা বাড়িঘর। তাই নিয়েই একটা গ্রাম। এই দেশের ভেতরই যেন আরেকটা দেশ। মনে হবে সভ্যতার শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়ে আছি। ধুসর জমিতে হাল দেওয়া হয়েছে। এখন এরকমই পড়ে থাকবে। শীতে টানা তুষারপাতের পর আসবে গ্রীষ্ম। এখানে বসন্তের কোকিল ডাকে না। ঋতু বলতে শীতেরই দাপট। আর কয়েক মাসের গ্রীষ্ম। সে গ্রীষ্ম মানেও প্রবল ঠান্ডা। শুধু তুষারপাতটুকু বন্ধ থাকে। তাই এখানকার মানুষ গ্রীষ্ম বলেন।। গ্রীষ্মের রোদের তাপে  ক্ষেতের  ওপর জমা বরফ গলে জল হবে। মাটি ভিজবে। তখন বোনা হবে বীজ। এক ফসলি জমি। সারা বছর চাষ সম্ভব নয়। বৃষ্টির বালাই নেই। নেই সেচ ব্যবস্থা। চাষ বলতেও সামান্য শস্য ও সবজি। প্রকৃতি চাষের জন্যও এখানে উদার নয়। উচ্চতা, রুক্ষ প্রকৃতি, একের পর এক প্রতিবন্ধকতা। তবু মানুষ আছেন। এখানেই আছেন। এভাবেই আছেন সারা জীবন। 
                                ছবি: সবার পিছনে আসছিল এই শিশুটি।

এই যেমন দেখতে পাচ্ছি,  চোখে রোদ্দুর মেখে ছুটে আসছে ছোট্ট শিশুর দল। এও এক রেস। প্রতিযোগিতা। কে আগে এসে পৌঁছাবে আমাদের কাছে। তার জন্য দৌড়। কিছুক্ষণের মধ্যেই একদল কচিকাঁচা আমাদের ঘিরে ধরল। হাত পেতে কিছু চাইছে। পকেট থেকে ক্যান্ডি আর চকোলেটগুলো বের করে ওদের দিকে বাড়িয়ে দিলাম। ওসব সঙ্গেই থাকে। নিজেও খাই পথ চলতে চলতে। নিমেষের মধ্যে ছোঁ মেরে সব নিয়ে নিল ওরা। তারপর সে কি আনন্দ ওদের চোখে মুখে। খুশির রোদ মেখে সব হৈ হৈ করে ফিরে যাচ্ছে। ওই শিশুদের দলে সবথেকে ছোট সাইজের এক খুদেও ছিল। বাকিদের সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে পিছিয়ে পড়েছিল ও। সবাই ওকে ফেলে এগিয়ে এসেছিল আমাদের কাছে। তা দেখে সে বেচারার কি কান্না। কাঁদতে কাঁদতেই চড়াই ভেঙে ছুটে আসছিল। বুঝে গিয়েছিল এই রেসে পিছিয়ে পড়ার ফলে ও আর শহুরে মানুষগুলোর কাছ থেকে ক্যান্ডি বা চকোলেট পাবে না। ও যখন পৌঁছোবে তখন বাকিরা আর কিছু রাখবে না ওর জন্য। না পাওয়ার ভয় তখন গ্রাস করেছিল ওকে। সামান্য ক্যান্ডি বা চকোলেট এখনও এই শিশুদের কাছে মহার্ঘ। যা পেলে ওদের মুখে আজও ফুটে ওঠে স্বর্গীয় এক হাসি। এই ভারতবর্ষ দেখার পর কোন মুখে রেস্তোঁরায় খাবার সাজিয়ে রেখে “দেখো আমি খাচ্ছি মাম্মি” বলে পোস্ট দেব? 
                           রুক্ষ প্রান্তর। হিক্কিম।


                       রুক্ষ পাহাড়ের কোলে ছোট্ট গ্রাম হিক্কিম ।


                       শুরু হয়ে গিয়েছে তুষারপাতের মরশুম।


                           হিক্কিমের রুক্ষ সৌন্দর্য।


                                এ ভাবেই রুক্ষ প্রান্তরে  চলে চাষের প্রস্তাতি।

Comments

  1. অজানাকে জানলাম আপনার চোখ দিয়ে।

    ReplyDelete
  2. This comment has been removed by the author.

    ReplyDelete
  3. This comment has been removed by the author.

    ReplyDelete
  4. Aamader sajano sohore sajano somasya gulo koto chhoto eder kachhe...

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog